বিশাল লোকসান আড়াল করে কৃত্রিম মুনাফা দেখানোর এক চরম জালিয়াতি উন্মোচিত হয়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে। আর্থিক খাতের এই নাজুক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনৈতিক ও প্রশ্নবিদ্ধ বিশেষ সুবিধার ঢাল ব্যবহার করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্রেফ ধোঁকা দিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। আন্তর্জাতিক হিসাব মানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ব্যাংকটি কাগজ-কলমে নিজেদের লাভজনক প্রমাণ করার যে অপচেষ্টা চালিয়েছে, নিরীক্ষকের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে তা পুরোপুরি ফাঁস হয়ে গেছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ শেয়ারপ্রতি ০.৭৪ টাকা দেখवून মোট ৮৬ কোটি ৫১ লাখ টাকার নিট মুনাফা দাবি করেছে। অথচ প্রকৃত হিসাব মান অনুযায়ী যদি ব্যাংকটি তাদের প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি বা প্রভিশন গঠন করত, তবে প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের পাহাড় দাঁড়াত ৫ হাজার ৩০৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। যা শেয়ারপ্রতি হিসাবে দাঁড়ায় ৪৬.০৮ টাকা লোকসান। একইভাবে, ব্যাংকটি শেয়ারপ্রতি ২১.১৬ টাকা করে মোট ২ হাজার ৪৩৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকার নিট সম্পদ দেখিয়েছে। বাস্তব সত্য হলো, আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে সঞ্চিতি গঠন করলে এই ব্যাংকের কোনো সম্পদের অস্তিত্বই থাকে না। উল্টো ২ হাজার ৮৬৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা শেয়ারপ্রতি ২৪.৯২ টাকার ঋণাত্মক সম্পদ তৈরি হয়।
ব্যাংকটির এই বিশাল অংকের জালিয়াতির মূল জায়গাটি হলো সঞ্চিতি ঘাটতি। আল-আরাফাহ ব্যাংকে প্রদত্ত ঋণ ও অফ ব্যালেন্স শীট আইটেমের বিপরীতে যেখানে ৬ হাজার ৯৮৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা সঞ্চিতি রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল, সেখানে তারা দেখিয়েছে মাত্র ১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা। অর্থাৎ, শুধু এখানেই ঘাটতি রাখা হয়েছে ৪ হাজার ৯৯৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর বাইরে অন্যান্য সম্পদে ৯৯.০২ কোটি টাকা, নন-ব্যাংকিং সম্পদে ৩.০১ কোটি টাকা এবং অন্যান্য ব্যাংকে থাকা সম্পদে ২০৬.১৯ কোটি টাকার বিশাল সঞ্চিতি ঘাটতি লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক এই সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। ব্যাংকের অপর্যাপ্ত মুনাফার দোহাই দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই বিশাল ঘাটতি ভবিষ্যতে পূরণের সুযোগ করে দিয়েছে, যা কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক হিসাব মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বর্তমানের ভয়ংকর আর্থিক ক্ষতিকে কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রেখে ভবিষ্যতে তা দেখানোর এই আত্মঘাতী সুযোগ মূলত বিনিয়োগকারীদের ওপর এক ধরনের বড় ফাঁদ।
১৯৯৮ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ১ হাজার ১৫১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের এই ব্যাংকটির ৮৪.৮৯ শতাংশ মালিকানাই সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের। সর্বশেষ কার্যদিবসে যার শেয়ার দর ছিল মাত্র ১৪.৫০ টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত প্রশ্রয়ে আল-আরাফাহ ব্যাংক যে হিসাব জালিয়াতি করেছে, তার চরম মাশুল এখন দিতে হবে এই সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরই।