শিরোনাম

ই-গভর্ন্যান্সে ডিজিটাল সেবার প্রতিশ্রুতি, বাস্তবে হয়রানি ও ম্যানুয়াল

  • Update Time : Monday, August 31, 2026

ডিজিটাল বাংলাদেশে ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে হাতের নাগালের মধ্যে দ্রুত ও ঝামেলা ছাড়া সেবা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবচিত্র উল্টো। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে নাগরিকরা ই-সেবা নিতে গিয়ে উল্টো নানামুখী হয়রানি, ডেটা ফাঁসের আতঙ্ক এবং তীব্র ম্যানুয়াল নির্ভরতার মুখোমুখি হচ্ছেন।

সেন্ট্রাল ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এক গবেষণায় সরকারি ডিজিটাল সেবার এমন চিত্র উঠে এসেছে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) গুলশানের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত  ‘এস্টাবলিশিং ইফেক্টিভ অ্যান্ড অ্যাকাউন্টাবল ই-গভর্নেন্স টু স্ট্রেন্থেন লোকাল গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউশনস বাই ফুলফিলিং দ্য নিডস অব ইউথ, জেন্ডার, অ্যান্ড মার্জিনালাইজড কমিউনিটিস’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এ বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে।

সিপিডির রিসার্চ ফেলো তামিম আহমেদ ও গবেষণা সহকারী সাবিনা শারমিন প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। গবেষণাপত্রটিতে বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার পর্যায়ে ই-গভর্ন্যান্সের বর্তমান অবস্থা, নাগরিক ও সরকারি অফিসগুলোর অবকাঠামোগত প্রস্তুতি, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা এবং সুপারিশগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়, স্থানীয় সরকার পর্যায়েই-গভর্নেন্সে ডিজিটাল ফরম্যাট আছে কিন্তু কাজ হয় ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ায়। প্রকৃত পক্ষে অনলাইনে সেবার আবেদন চালু করা হলেও ম্যানুয়াল কাগজপত্রের হাত থেকে নিস্তার মেলেনি সাধারণ মানুষের। গবেষণায় দেখা যায়, নারীদের মাত্র ৩১.৯ শতাংশ এবং যুবদের ১৭.৮ শতাংশ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি অনলাইনে সেবা সম্পন্ন করতে পেরেছেন। ডিজিটাল আবেদনের পরও ৫৪.৩ শতাংশ নারী ও ৪৭.৭ শতাংশ যুবকে সশরীরে সরকারি দপ্তরে গিয়ে কাগজের নথি জমা দিতে হয়।

গবেষণায় অবকাঠামোর চরম সংকট উঠে এসেছে। ই-গভর্নেন্স বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার অফিসগুলোর সার্বিক প্রস্তুতি স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ৩৮.৯, যার মধ্যে অবকাঠামোগত প্রস্তুতির হার আরও করুণ, মাত্র ২৪.১।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন কৃষি অফিসগুলোতে গড়ে সচল কম্পিউটার রয়েছে মাত্র ০.১৫টি, যার ৪৪ শতাংশই নষ্ট। বিদ্যুৎ না থাকলে সেবা বন্ধ হয়ে যায়, কারণ ইউনিয়ন পরিষদের ৬৭ শতাংশ এবং ইউনিয়ন কৃষি অফিসের ৯৭ শতাংশ কার্যালয়ে কোনো আইপিএস বা জেনারেটর ব্যাকআপ নেই। ই-গভর্নেন্স প্রস্তুতিতে ময়মনসিংহের স্কোর ৫৭.৩ হলেও রংপুরের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়, মাত্র ৮.৮।

গবেষণায় ডিজিটাল সেবার জন্য নিজস্ব তথ্য জমা দেওয়ার পর বড় ধরনের নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়ছেন নাগরিকরা, বিশেষ করে নারীরা। সেবায় তথ্য দিতে গিয়ে ৫৮ শতাংশ নারী অনিরাপদ বোধ করেন এবং ৭৩.২ শতাংশ নারী ডেটা লিক বা তথ্য হ্যাক হওয়ার ভয়ে থাকেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ই-সেবা নেওয়ার পর অপব্যবহারের শিকার হয়েছেন ৬১.০ শতাংশ নারী। সেবা নিতে গিয়ে দেওয়া ফোন নম্বরে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রয়োজনীয় কল এবং মেসেজ পাওয়ার অভিযোগ করেছেন তারা। সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তি, অতিরিক্ত টাকা দাবি বা অনিয়ম হলেও কোনো কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায় না। কোনো অফিসিয়াল অভিযোগ দায়ের করার ব্যবস্থা বা সঠিক মাধ্যম না থাকায় ৮৩.৩ শতাংশ নারী এবং ৭৮.৯ শতাংশ যুব কখনো কোনো অভিযোগই জমা দেননি।

অনুষ্ঠানে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ডিজিটাল মাধ্যমে নাগরিকরা তাদের সেবা পাওয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার যদি সুযোগ বাড়াতে পারে, তাহলে সেটাকে কার্যকর ডিজিটালাইজেশন কিংবা ই-গভর্নেন্স আমরা বলতে পারবো। কিন্তু মানুষকে সেবা পেতে বারবার সরকারি অফিসে-দপ্তরে যায়, বারবার যাতায়াত করে। এতে সময় নষ্ট হয়; অনেক সময় হয়রানি এবং দুর্নীতিও থাকে।

‘আরেকটি বিষয় হচ্ছে ডিজিটাল সুশাসনে কারা কারা এর সুবিধাভোগী হতে পারে। একটি জনগোষ্ঠী হচ্ছে তরুণরা এবং ডিজিটাল সুশাসনে তরুণদের চাহিদাকে কিন্তু বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। স্থানীয় সরকার অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তরুণদের যে কর্মসংস্থান, সেই কর্মসংস্থানের চাহিদা মেটানো, দক্ষতা উন্নয়ন। অংশগ্রহণমূলক বাজেট প্রণয়ন এবং স্থানীয় পরিকল্পনায় তরুণদের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন, কারণ তারা জনগোষ্ঠীর একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ,’ বলেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, নারীদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে এখানে প্রযুক্তির প্রবেশের সুযোগের সঙ্গে সঙ্গে স্মার্টফোন, আর্থিক সেবা এবং ডিজিটাল দক্ষতায় নারীর সুবিধা ও সুযোগ সুবিধা এবং অনলাইন হয়রানি, তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। ই-গভর্নেন্স ব্যবস্থা প্রণয়ন এবং এটার তদারকিতেও নারী জনপ্রতিনিধি ও নারী সংগঠনকে সম্পৃক্ত করতে হবে। তারপরে হচ্ছে, যারা সমাজের মার্জিনালাইজড জনগোষ্ঠী প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, জাতিগত সংখ্যালঘু, নিম্ন আয়ের পরিবার, দুর্গম অঞ্চলের বাসিন্দা ও সীমিত শিক্ষার মানুষ তারাও যেন বাদ না পড়ে এই ই-গভর্ন্যান্সের সেবার মধ্যে তারা যেন অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এই সেবাটা বাংলা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্থানীয় ভাষাতেও দিতে হবে। তাছাড়া কণ্ঠনির্ভর সেবা, প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থা এবং ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে সহায়তাপ্রাপ্ত সেবারও সুযোগ থাকতে হবে।

ফাহমিদা বলেন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় বাজেট, প্রকল্প ব্যয়, সুবিধাভোগীদের তালিকা, সরকারি ক্রয় এবং সেবা দেওয়ার সময়সীমা উন্মুক্ত করতে হবে, সবাই যাতে অংশগ্রহণ করতে পারে। তাছাড়া নাগরিকদের অভিযোগ, অভিযোগ ট্র্যাকিং, তার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের কার্যকর ডিজিটাল ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। শুধুমাত্র প্রযুক্তি দিলেই যে সুশাসন অটোমেটিক্যালি হয়ে যাবে সেরকম না। নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ, প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা, তথ্যভাণ্ডারের সমন্বয়, সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে। ই-গভর্ন্যান্সকে নাগরিক এবং স্থানীয় সরকারের মধ্যে একটা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক হতে হবে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন অ্যাস্পায়ার-টু ইনোভেট এর সিনিয়র কনসালটেন্ট ফজলুল জাহেদ পাভেল, এমআইএস বিশেষজ্ঞ আমিনুল মহাইমেন ও আইসোশ্যাল-এর চেয়ারপারস ড. অনন্যা রায়হান প্রমুখ।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2026 pujibazarpratidin
Site Customized By NewsTech.Com