শিরোনাম
বিশ্ববাজারে লাগাতার কমছে তেলের দাম হরমুজ প্রণালি খুলতে যুক্তরাষ্ট্রকে যে শর্ত দিল ইরান বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অংশগ্রহণমূলক চুক্তি স্বাক্ষর ক্রিকেটের উন্নয়নে ওয়ালটনের অব্যাহত সহযোগিতা প্রত্যাশা বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন বেড়েছে ঋণ জালিয়াতি ও সম্পদ অপব্যবহার ঠেকাতে ১০ হাজার মামলা করেছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক দরবৃদ্ধির শীর্ষে ফাইন ফুডস সিটি ব্যাংক পারপেচুয়াল বন্ডের অর্ধবার্ষিকের কুপন রেট ঘোষণা পরিচালনা পর্ষদের তালিকা প্রকাশ করলো নাভানা ফার্মা ভূমিকম্পের ৩ মিনিট পরই নেপালে আকস্মিক বন্যা-ভূমিধস, নিহত বেড়ে ১৫৭

তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের অনিয়ম-দুর্নীতি: আত্মসাৎ ৪৪ কোটি টাকা

  • Update Time : Wednesday, August 26, 2026

অনিয়ম-দুর্নীতি করে কোম্পানির তহবিল থেকে আত্মাসাৎ করা হয়েছে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা। এই টাকা আত্মাসাৎ করা হয়েছে বাকী ব্যবসা, প্রিমিয়াম আয় গোপন, ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্টে গোজাঁমিল, অফিস সাজসজ্জার নামে ভুয়া অগ্রিম, ফেয়ার ভ্যালু রিজার্ভের আড়ালে লোকসান গোপন, খাত বিহীন অগ্রীমসহ স্টাফদের নামে ভূঁয়া অগ্রীম দেখিয়ে।

তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের ২০১৯ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র অনুসন্ধানে।

অগ্রিম বেতনের নামে ১৩.১১ কোটি টাকা লোপাট!

বেতন খাতে অগ্রীম (এডভান্স এগেইন্সট স্যালারি) দেখিয়ে তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের তহবিল থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে ১৩ কোটি ১১ লাখ ২২ হাজার ৬৩৪ টাকা। এর মধ্যে ২০২৫ সালেই সরিয়ে নেয়া হয়েছে ৪ কোটি ৯২ লাখ ৮৭ হাজার ৭৪০ টাকা।

প্রতি বছর কোম্পানিটির বেতন খাতে অগ্রিমের পরিমাণ বাড়লেও কোনো বছরই তা সমন্বয় বা আদায় হয়নি। ফলে ২০১৯ সালে বেতন খাতে যে অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ৫৭ লাখ ১৭ হাজার ৮৩৫ টাকা; তা ক্রমান্বয়ে বেড়ে ২০২৪ সালে দাঁড়ায় ৮ কোটি ১৮ লাখ ৩৪ হাজার ৮৯০ টাকায়।

তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে বেতন-ভাতা খাতে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ৩৩ কোটি ৫৫ লাখ ৩১ হাজার ৭৯৩ টাকা। অর্থাৎ, বেতন-ভাতা খাতে কোম্পানিটির মাসিক ব্যয় গড়ে ২ কোটি ৭৯ লাখ ৬০ হাজার ৯৮৩ টাকা।

এই ব্যয় কোম্পানিটির মোট প্রিমিয়ামের ৩.৪৫ শতাংশ এবং নিট প্রিমিয়ামের ৪.৮৬ শতাংশ।

এত বড় অঙ্কের বেতন-ভাতা পরিশোধ করার পরও অগ্রিম বেতন খাতে ১৩ কোটি ১১ লাখ ২২ হাজার ৬৩৪ টাকা দেখানোকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এক্ষেত্রে অগ্রিম বেতন খাতে মোটা অঙ্কের খরচ দেখিয়ে তা আত্মসাৎ করা হয়ে থাকতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

কোটি টাকার প্রিমিয়াম আয় গোপন!

তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের ২০২২ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে নেট প্রিমিয়াম আয় দেখানো হয়েছে ৫৩ কোটি ৮৪ হাজার ৪০৪ টাকা। তবে বিশেষ নিরীক্ষকদের হিসাবে কোম্পানিটির নেট প্রিমিয়াম আয়ের পরিমাণ ৫৪ কোটি ১ লাখ ৪০ হাজার ৩৫৩ টাকা।

এই হিসাবে কোম্পানিটি ১ কোটি ৫৫ হাজার ৯৪৯ টাকার প্রিমিয়াম আয় গোপন করেছে।

ব্যাংক স্টেটমেন্ট, লেজার বুক, ভ্যাট চালান ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে প্রিমিয়াম গোপনের এই তথ্য তুলে ধরেছে বিশেষ নিরীক্ষক দল। তবে বীমা কোম্পানিটি থেকে কোন ব্যাংক সমন্বয় বিবরনী সরবরাহ করা হয়নি।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ২০২২ সালে তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের ৩টি ব্যাংক একাউন্টে প্রিমিয়াম ও ভ্যাট-স্ট্যাম্প বাবদ মোট জমার পরিমাণ ৭২ কোটি ৩৬ লাখ ৩৩ হাজার ২১১ টাকা। আর ব্যাংকে ওপেনিং ব্যালান্স ছিল ১ কোটি ৮৩ লাখ ১৮ হাজার ২৮৯ টাকা।

এর মধ্যে ভ্যাট, স্ট্যাম্প ডিউটি, রিফান্ড, কো-ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম, ডিপোজিট ক্লিয়ারিং ইন ট্রানজিট, প্রিমিয়াম ডিপোজিট ক্লোজিং ব্যালান্স এবং ক্লোজিং ব্যালান্সের হিসাবের পরিমাণ মোট ২০ কোটি ১৮ লাখ ১১ হাজার ১৪৭ টাকা।

ওপেনিং ব্যালান্স এবং ব্যাংক রিসিভের মোট টাকা থেকে এসব খরচ ও ব্যালান্সের হিসাব বাদ দিলে ২০২২ সালে কোম্পানিটির প্রকৃত প্রিমিয়াম আয় দাঁড়ায় ৫৪ কোটি ১ লাখ ৪০ হাজার ৩৫৩ টাকা।

অগ্রিম ভ্যাটের নামে ৬৪.৮৯ লাখ টাকার তহবিল তসরুপ!

দেশের নন-লাইফ বীমা খাতের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয় এবং অপরিশোধিত অংশটুকু আর্থিক বিবরণীতে ‘ভ্যাট দায়’ হিসেবে দেখানো হয়। এই খাতে অগ্রিম ভ্যাট প্রদানের কোনো আইনি সুযোগ বা বিধান নেই।

অথচ তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স ২০২৫ সালের ব্যালান্স শিটে ভ্যাট বাবদ ৬৪ লাখ ৮৮ হাজার ৮২৬ টাকা ভ্যাট বাবদ ‘অগ্রিম প্রদান’ হিসেবে দেখিয়েছে।

অপরদিকে একই বছরের আর্থিক প্রতিবেদনে প্রিমিয়ামের ওপর ভ্যাট বাবদ আরো ৫৭ লাখ ১৭ হাজার ১১৪ টাকা বকেয়া বা প্রদেয় হিসেবে বিবিধ পাওনাদার খতিয়ানে যুক্ত রয়েছে।

একদিকে সরকারের ভ্যাট বকেয়া রাখা, অন্যদিকে নিয়মবহির্ভূতভাবে কোটি টাকার কাছাকাছি অগ্রিম ভ্যাট প্রদানের এই স্ববিরোধী হিসাবকে- কোম্পানির তহবিল থেকে অর্থ সরিয়ে নেয়ার ঘটনা আড়াল করার একটি অপচেষ্টা বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্টে গোজাঁমিল, ৩৩ লাখ টাকা বকেয়া ডিভিডেন্ড দেখানো হলো ‘পরিশোধ’

বার্ষিক সাধারণ সভায় অনুমোদিত ডিভিডেন্ড সাধারণত পরবর্তী বছরে পরিশোধ করা হয় এবং বকেয়া থাকলে তা ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্টে দেখানো নিয়ম নয়। তবে বকেয়া থাকার পরও তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স তাদের ঘোষিত ডিভিডেন্ডের শতভাগ পরিশোধ দেখিয়ে আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করেছে।

২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত সব ডিভিডেন্ড পরিশোধের দাবি করা হয়েছে ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্টে। অপরদিকে ব্যালান্স শিটে ‘লায়াবিলিটি এন্ড প্রভিশন’ এর ২০ নম্বর নোটে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩২ লাখ ৭৩ হাজার ২৮৯ টাকার ডিভিডেন্ড বকেয়া দেখানো হয়েছে।

অর্থাৎ ডিভিডেন্ডের বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করেই ‘পরিশোধিত’ দেখিয়ে ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্টে গোঁজামিল দেয়া হয়েছে তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদনে।

কমিশন পাওনা দেখিয়ে ১ কোটি ৪২ টাকার মুনাফা বৃদ্ধি, নেই কোন দেনাদার

দেনাদার নেই তথা কোন প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির কাছে কমিশন পাওয়া যাবে তার কোনো বিশদ বিবরন নেই। অথচ ‘কমিশন রিসিভেবল’ খাতে প্রাপ্য কমিশন আয় দেখিয়ে ১ কোটি ৪১ লাখ ৭১ হাজার ৭০০ টাকার মুনাফা বাড়িয়েছে তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স।

আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে কোম্পানিটির কমিশন বাবদ পাওনা ছিল ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৪৩৮ টাকা। ২০২৫ সালে এসে এই কমিশন পাওনা দেখানো হয় ১ কোটি ৪১ লাখ ৭১ হাজার ৭০০ টাকা। অর্থাৎ ২০২৫ সালেই কোম্পানিটি ১ কোটি ৩১ লাখ ২২ হাজার ২৬২ টাকার মুনাফা বেশি দেখিয়েছে।

কমিশন বাবদ এতো টাকা প্রাপ্য দেখানো হলেও সেটা- পুনর্বীমা কমিশন নাকি কো-ইন্স্যুরেন্স কমিশন তার কোনো বিবরণ নেই তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদনে।

হিসাব বিশেষজ্ঞদের মতে, কমিশন পাওনার এই ভুয়া হিসাব দেখিয়ে কোম্পানির মুনাফা বাড়িয়ে ডিভিডেন্ড বের করার একটা কৌশল হতে পারে।

বাকীতে বীমা ব্যবসাডিপোজিট ক্লিয়ারিং হিসাবে ৪০ লাখ টাকা

ডিপোজিট ক্লিয়ারিং হিসাবে ৪০ লাখ ১৪ হাজার ১৩১ টাকা দেখানো হয়েছে তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণত বাকী ব্যবসার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পার্টির নিকট থেকে চেক নিয়ে তার বিপরীতে মানি রিসিপ্ট দেয়া হয় এবং ওই চেকের বিপরীতে প্রিমিয়াম আয় ‘ডিপোজিট ক্লিয়ারিং’ তথা বাকী দেখানো হয়।

বীমা আইন অনুসারে এ ধরণের ব্যবসা সম্পূর্ণ অবৈধ।

তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের এই ক্ষেত্রেও বাকী ব্যবসা করে অনাদায়ী টাকার চেক ডিপোজিট ক্লিয়ারিং হিসাবে দেখানো হয়ে থাকতে পারে। প্রকৃতপক্ষে প্রিমিয়ামের এই টাকা পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ ৪০ লাখ ১৪ হাজার ১৩১ টাকার ভূঁয়া মুনাফা দেখিয়ে কোম্পানির তহবিল থেকে অর্থ উত্তোলন করে নেয়া হয়েছে।

দেনাদারহীন ৩.৯৬ কোটি টাকার ‘পুনর্বীমা পোর্টফোলিও প্রিমিয়াম’: কৃত্রিম মুনাফায় ডিভিডেন্ড

রি-ইন্স্যুরেন্স পোর্টফোলিও প্রিমিয়াম খাতে পাওনা দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ৯৬ লাখ ১০ হাজার ৬৯০ টাকা। অথচ এই পুনর্বীমা পোর্টফোলিও প্রিমিয়াম কার কাছে পাওয়া যাবে, তার কোনো বিস্তারিত তথ্য নেই আর্থিক প্রতিবেদনে।

২০১৯ সাল থেকে শুরু করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর প্রায় একই পরিমাণ অর্থ পাওনা হিসাবে দেখানো হচ্ছে তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের সানড্রি ডেটরস খাতে। অথচ বছরের পর বছর এসব অর্থের কোনো আদায় নেই।

এমনকি দেনাদার না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে দেখানো ‘রি-ইন্স্যুরেন্স পোর্টফোলিও প্রিমিয়াম’র এই অর্থ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই।

তবে সাধারণ বীমা করপোরেশনের নিকট কোম্পানিটির পাওনা পুনর্বীমা প্রিমিয়ামের ৮৭ লাখ ২৬ হাজার ১শ’ টাকা ক্রমান্বয়ে পিএসবি ও বকেয়া দাবির সাথে সমন্বয় করে আদায় হচ্ছে।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, দেনাদারহীন ৩ কোটি ৯৬ লাখ ১০ হাজার ৬৯০ টাকার পুনর্বীমা পোর্টফোলিও প্রিমিয়াম পাওনা দেখিয়ে কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধি করে ডিভিডেন্ড তুলে নেয়া হয়েছে কিনা!

ফেয়ার ভ্যালু রিজার্ভের আড়ালে ৬.৯১ কোটি টাকার লোকসান গোপন

একাউন্টিং নীতিমালা অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের মূল্য কমে গেলে সেই অনাদায়ী ক্ষতি বাধ্যতামূলকভাবে কোম্পানির লাভ-ক্ষতি হিসাবে ডেবিট বা খরচ হিসেবে চার্জ করতে হয়। একই সঙ্গে তা ব্যালান্স শিটের ‘ফেয়ার ভ্যালু রিজার্ভ’ খাতে প্রদর্শন করারও নিয়ম রয়েছে।

অথচ, কোম্পানিটি এই লোকসান লাভ-ক্ষতি হিসাবে ডেবিট না করে, সরাসরি ব্যালান্সশিটের ফেয়ার ভ্যালু রিজার্ভ অ্যাকাউন্টে ৬ কোটি ৯১ লাখ ৭৭ হাজার ৭৭৬ টাকা নেগেটিভ ব্যালান্স হিসেবে দেখিয়ে যাচ্ছে। এই ধরণের হিসাবের ট্রেটমেন্টকে উইন্ড্রো ড্রেসিং বলা হয়ে থাকে।

হিসাব মান বহির্ভূত এই উইন্ড্রো ড্রেসিংয়ের ফলে কোম্পানির প্রকৃত নিট মুনাফা থেকে প্রায় পৌনে ৭ কোটি টাকা কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। নিরীক্ষকদের মতে, এটি বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করতে আর্থিক বিবরণী ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর একটি অপচেষ্টা।

ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্টে অসঙ্গতি: সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮৯ লাখ টাকার ঋণ গোপন

সাবসিডিয়ারি বা সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রেও আর্থিক অসঙ্গতি ও তথ্য গোপনের প্রমাণ মিলেছে তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে।

তাকাফুল ইসলামী সিকিউরিটিজের (সাবসিডিয়ারি) ২০২২ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স (মূল কোম্পানি) থেকে ৮৮ লাখ ৮০ হাজার ৪৫৭ টাকা ঋণ হিসেবে গ্রহণ করেছে।

অপরদিকে তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্টে সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে দেয়া এই ঋণের কোনো অস্তিত্ব বা হিসাব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্টে গড়মিল: তাকাফুল সিকিউরিটিজে ৭৯ লাখ টাকার বিনিয়োগ উধাও!

তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের ২০২১ সালের নিরীক্ষিত ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্ট অনুযায়ী, কোম্পানিটি তাদের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান তাকাফুল ইসলামী সিকিউরিটিজে ৪ কোটি ৯৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা বিনিয়োগ বা ঋণ সুবিধা প্রদান করেছে।

তাকাফুল ইসলামী সিকিউরিটিজের ২০২১ সালের ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি মূল কোম্পানি থেকে ৪ কোটি ২০ লাখ ৬১ হাজার ৮০০ টাকা ঋণ নিয়েছে।

অর্থাৎ, সহযোগী প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ৭৯ লাখ ৮ হাজার ২শ’ টাকা কম বা গোপন করা হয়েছে।

অন্যান্য অগ্রীম’ নামে লোপাট প্রায় ৮ লাখ টাকা!

বেতন খাতে বড় অঙ্কের অর্থ অগ্রিম দেখানোর পরও ‘অন্যান্য অগ্রিম’ খাতে ৭ লাখ ৮৬ হাজার ২০৩ টাকা দেখানো হয়েছে। অথচ এই খরচের বিস্তারিত হিসাব বা কোনো ব্যাখ্যা প্রদান করেনি তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স।

এর আগে ২০২৪ সালেও কোম্পানিটির এই ‘অন্যান্য অগ্রিম’ খাতে খরচের পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ৭৬৭ টাকা। কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে ‘সান্ড্রি ডেটরস‘ হিসেবে খাতবিহীন এই অগ্রিম দেখানো হয়েছে।

দরপত্র ছাড়াই আড়াই কোটির অফিস ডেকোরেশন: ‘ভুয়া’ অগ্রিম দেখিয়ে আরও ২.৬২ কোটি টাকা লোপাট!

২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাবসিডিয়ারীসহ অফিস সাজসজ্জা বাবদ ২ কোটি ৬৯ লাখ ১৮,৮২৮ টাকা প্রকৃত ব্যয় দেখিয়েছে তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ ব্যয় করা হয় ২০২২ সালে, ১ কোটি ১৪ লাখ ৭৫ হাজার ৫৭৩ টাকা।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, কোন ধরণের দরপত্র ছাড়াই ২০২১ সালের ২৮ অক্টোবর কোম্পানির ডেকোরেশন সাব-কমিটির ৩য় সভায় মেসার্স সাদাত ট্রেডার্সকে এই কাজের অনুমোদন দেয়া হয়। অনুমোদনের সময়- কাজের পরিমাণ বা কোনো দর উল্লেখ না করে, কেবল ‘অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের’ সাথে মৌখিক আলাপে মূল্য নির্ধারণের নজিরবিহীন শর্ত রাখা হয়।

আড়াই কোটিরও বেশি টাকা চূড়ান্ত ব্যয় দেখানোর পরও আর্থিক প্রতিবেদনে ডেকোরেশন খাতে অতিরিক্ত আরও ২ কোটি ৬১ লাখ ৮৫ হাজার ৮১৭ টাকা ‘অগ্রিম’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর দফায় দফায় এই অগ্রিমের অঙ্ক বাড়ানো হয়েছে।

হিসাব বিশেষজ্ঞদের মতে, কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর সমপরিমাণ অর্থ অগ্রিম হিসেবে দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে ডেকোরেশনের নামে কাল্পনিক খাত তৈরি করে কোম্পানির তহবিল থেকে নগদ অর্থ তুলে আত্মসাৎ করা হয়ে থাকতে পারে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের!

ব্যাংক ঋণ ১১.৬৭ কোটি টাকা, কাগজে-কলমে মুনাফা দেখিয়ে লভ্যাংশ প্রদান

কাগজে-কলমে নিয়মিত মুনাফা ও লভ্যাংশ (ডিভিডেন্ড) ঘোষণা করলেও এফডিআর বন্ধক রেখে ১১ কোটি ৬৭ লাখ ১৪ হাজার টাকার ঋণ ও ওভারড্রাফট গ্রহণ করেছে তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স।ফলে প্রশ্ন উঠেছে কোম্পানিটির প্রকৃত মুনাফা ও আর্থিক প্রতিবেদনের হিসাব নিয়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, কোম্পানি লাভজনক অবস্থায় থাকলে নিশ্চিত মুনাফার এফডিআর বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।এক্ষেত্রে নগদ তহবিলের সংকট ও বড় ধরনের হিসাব কারচুপি ঢাকতে এমন পদক্ষেপ নেয়া হয়ে থাকতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ইসলামী ব্যাংকে রাখা ১২ কোটি ২৭ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত বন্ধক রেখে ১১ কোটি ৪ লাখ টাকার ঋণ (কর্জে হাসানা) নেয়া হয়েছে।

এ ছাড়াও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে রাখা ৭০ লাখ টাকার এফডিআর বন্ধক রেখে ৬৩ লাখ টাকার ওভারড্রাফট সুবিধা নেয়া হয়েছে, যার বিপরীতে অতিরিক্ত ২% সার্ভিস চার্জ গুণছে কোম্পানিটি।

আইডিআরএ’তে শতকোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ শেয়ারহোল্ডারের, ৩ মাস পর অস্বীকার

তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহীর বিরুদ্ধে কোম্পানির প্রায় ১০০ কোটি টাকা অনিয়মআত্মসাতের অভিযোগ করা হয় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে। ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আসমা নাজনীন নামে প্রতিষ্ঠানটির একজন শেয়ারহোল্ডার এই অভিযোগ করেন।

ভুয়া প্রিমিয়াম আয় প্রদর্শন, ‘ডিপোজিট ক্লিয়ারিং’-এর নামে বাকিতে ব্যবসাকমিশন ব্যয় কম দেখিয়ে তা অগ্রিমে স্থানান্তর এবং স্টাফ ও অফিস ডেকোরেশনের নামে ভুয়া অগ্রিম ব্যয়সহ ১৭টি খাতে এসব অনিয়মদুর্নীতির অভিযোগ করা হয় আসমা নাজনীনের ওই অভিযোগপত্রে।

তবেএই অভিযোগ দাখিলের তিন মাসের মাথায় বিষয়টি অস্বীকার করে আইডিআরএর কাছে একটি পত্র দাখিল করেন আসমা নাজনীন নামের ওই শেয়ারহোল্ডার। অভিযোগ পত্রের স্বাক্ষর মিল না থাকার দাবিও করেন তিনি। গত ১৭ মে তিনি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে এই চিঠি দেন।

অনিয়ম-আত্মসাতের বিষয়ে যা বলছে তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স

তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন কোম্পানিটির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ। তিনি জানান, এ সংক্রান্ত সব তথ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’কে প্রদান করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে যে কোনো জিজ্ঞাসার জন্য আইডিআরএ’র সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

যা বলছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ

তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের অনিয়ম-আত্মসাতের বিষয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, বিষয়টি আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় পদেক্ষপ নেবে কর্তৃপক্ষ।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2026 pujibazarpratidin
Site Customized By NewsTech.Com