বিভিন্ন নীতিগত সংস্কারের ঘোষণা এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয় বৃদ্ধির প্রভাবে দেশের পুঁজিবাজারে টানা চার মাস ধরে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় রয়েছে। এর মধ্যে সদ্য সমাপ্ত জুলাই মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছায়।
জুলাই শেষে ডিএসইএক্স ১৩২ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ৩০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮৯৬ পয়েন্টে। একই সময়ে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা বাড়ায় বাজারে লেনদেনের গতিও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত মাসে গড় দৈনিক লেনদেন ৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৫৫ কোটি টাকায়।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, জুলাইয়ের শুরু থেকেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার কেনার প্রবণতা বাড়তে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় মাসের মাঝামাঝি সময়ে ডিএসইএক্স ৫ হাজার ৯২৬ দশমিক ২৮ পয়েন্টে পৌঁছে, যা গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থান। একই সময়ে দৈনিক লেনদেন বেড়ে ১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়, যা দুই বছরের সর্বোচ্চ লেনদেন।
তবে মাসের মাঝামাঝি সময়ে মার্জিন ঋণের চূড়ান্ত রূপরেখা নিয়ে তৈরি হওয়া সাময়িক অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে দেখা দেওয়া ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে কিছু বিনিয়োগকারী মুনাফা তুলে নিতে শেয়ার বিক্রি শুরু করেন।
পরে জুলাইয়ের শেষভাগে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়া এবং ডিসেম্বরে হিসাব বছর শেষ হওয়া তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর প্রত্যাশার চেয়ে ভালো আয় প্রকাশের খবর বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে শেষ দিকে আবারও শেয়ার কেনার চাপ বাড়ে এবং টানা চতুর্থ মাসের মতো ইতিবাচক অবস্থানে থাকে পুঁজিবাজার।
খাতভিত্তিক পারফরম্যান্সে জুলাই মাসে সর্বোচ্চ ২১ দশমিক ৯৮ শতাংশ রিটার্ন দিয়েছে মিউচুয়াল ফান্ড খাত। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিল বস্ত্র খাত, যেখানে রিটার্ন এসেছে ১০ দশমিক ৮১ শতাংশ।
এ ছাড়া খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতে ৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ, পাট খাতে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ, ভ্রমণ ও অবকাশ খাতে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ, চামড়া খাতে ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে ৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন দেখা গেছে।
এর বিপরীতে শুধু টেলিযোগাযোগ খাতে দশমিক ৪৯ শতাংশ ঋণাত্মক রিটার্ন ছিল।
দৈনিক গড় লেনদেনের হিসাবে জুলাই মাসে শীর্ষে ছিল বস্ত্র খাত, যা মোট লেনদেনের ১৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ দখল করে। এর পরেই ছিল বীমা খাত ১৪ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং ওষুধ ও রসায়ন খাত ১১ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
গত মাসে সূচকের উত্থানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবিসি), বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও পূবালী ব্যাংক।
বিএটিবিসির শেয়ারের দর ১৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ বাড়ায় ডিএসইএক্সে ১৮ দশমিক ১৬ পয়েন্ট যোগ হয়েছে। পাশাপাশি আইডিএলসি, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, বিএসআরএম স্টিল ও প্রিমিয়ার ব্যাংকও সূচকে ইতিবাচক অবদান রেখেছে।
অন্যদিকে সূচকের গতি মন্থর করতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা ছিল বেক্সিমকো লিমিটেডের। কোম্পানিটির শেয়ারের দর ২০ দশমিক ৮২ শতাংশ কমে যাওয়ায় সূচক ১৪ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট হারিয়েছে। এ ছাড়া ব্র্যাক ব্যাংকের দর ৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ কমায় সূচক ১০ দশমিক ৫৪ পয়েন্ট এবং স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের দর ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কমায় সূচক ৮ দশমিক ২৮ পয়েন্ট কমেছে।
জুলাইয়ে লেনদেনের ভিত্তিতে শীর্ষে থাকা শেয়ারগুলোর মধ্যে ছিল মালেক স্পিনিং, আইটি কনসালট্যান্ট ও সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মুদ্রানীতি এবং ঋণের সুদের হার কমার কারণে পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যক্তিশ্রেণীর বিনিয়োগে গতি ফেরাতে নীতি সুদহার (পলিসি রেট) ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়েছে। এর ফলে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার কমে এসেছে, যা ব্যাংক খাতে তারল্য বাড়ানোর পাশাপাশি পুঁজিবাজারে মূলধন প্রবাহ বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।
এ ছাড়া ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বেশ কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানির ভালো আর্থিক পারফরম্যান্সও বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এশিয়ার পুঁজিবাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, একই সময়ে ভারতের প্রধান সূচক ২ দশমিক ১১ শতাংশ, থাইল্যান্ডের সূচক ২ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ার পুঁজিবাজার সূচক ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের কেএসই-১০০ সূচক ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ, শ্রীলংকার এএসপিআই ৫ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ভিএন সূচক ৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমেছে।