গ্রাহকের বিমা দাবির টাকা পরিশোধ করতে না পারলেও ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে লাগামহীন ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিডেট। প্রতিষ্ঠানটির কয়েক হাজার কোটি টাকার বিমা দাবি বকেয়া। একদিকে যেমন বিমা দাবি পরিশোধে সর্বনিন্মে অবস্থান, অন্যদিকে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের নামে ভোগ-বিলাসে এগিয়ে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এদিকে, কোম্পানিটির লাইফফান্ডের অবস্থাও অত্যান্ত নাজুক। শুধু তাই নয়, ফারইস্ট লাইফ পদে পদে লঙ্ঘন করছে আইন। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীমাহীন অনিয়ম আর লুটপাটের ফলে ভয়াবহ তারল্য সংকটে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি হাতিয়ে নেয় কয়েক হাজার কোটি টাকা।
গণঅভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেয় নতুন চেয়ারম্যান, কোনো উন্নতি নেই
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের দায়িত্ব নেন বিএনপি নেতা ফখরুল ইসলাম, পরে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে নোয়াখালী-০৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কোম্পানির ২৫তম বোর্ড সভায় তাকে চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। তার দায়িত্ব নেওয়ার ১৮ মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটির কোনো উন্নতি হয়নি। ফারইস্ট লাইফ গ্রাহকের বিমা দাবির টাকা দিতে না পারলেও আইন লঙ্ঘন করে ব্যবস্থাপনা খাতে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করেছে। আর্থিক দিক থেকে সবচেয়ে দুর্বল হলেও ভোগ-বিলাসে সবচেয়ে এগিয়ে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে বিমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবার প্রথমে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আইডিআরএ’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৫ সালে ২০টি জীবন বিমা কোম্পানি ব্যবস্থাপনা খাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেছে ১৩২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।এর মধ্যে ফারইস্ট লাইফই ব্যবস্থাপনা খাতে ব্যয় করেছে ৮০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। আইন অনুযায়ী এ খাতে সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা ছিল ৫২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ আর্থিক দুর্দশার মধ্যেও আইন লঙ্ঘন করে কোম্পানিটি অবৈধভাবে ২৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। ভয়াবহ তারল্য সংকটেও কোম্পানিটির এত টাকা ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে খরচ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সাড়ে ৫ লাখেরও বেশি গ্রাহক পাননি বিমার টাকা
ফারইস্টের বিমা দাবির টাকার জন্য গ্রাহকদের মধ্যে দীর্ঘদিন অস্থিরতা বিরাজ করছে। পলিসি পরিপক্ক হয়ে বছরের পর বছর সময় কেটে গেলেও তারল্য সংকটে গ্রাহকদের টাকা দিতে পারছে না কোম্পানিটি। ফারইস্ট লাইফের স্থানীয় শাখাগুলোতে টাকা না পেয়ে প্রধান কার্যালয়ে আসছেন অনেকে, তাতেও মিলছে না ফল। দ্বারে দ্বারে ঘুরে টাকা না পেয়ে অনেকে অভিযোগ করছেন বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষে (আইডিআরএ)। বিমা আইন অনুযায়ী পলিসি পরিপক্ক হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে পরিশোধের বিধান থাকলেও তা মানছে না ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
কোম্পানিটির কয়েকজন ভুক্তভোগী গ্রাহকের সঙ্গে আলাপ হয় এ প্রতিবেদকের। সুমাইয়া নামের একজন গ্রাহক জানান, তার পলিসি পরিপক্ক হয়েছে ২০২১ সালে। অর্থাৎ প্রায় ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি বিমা দাবির টাকা পাননি। পরবর্তীতে টাকা না পেয়ে অভিযোগ করেন নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আইডিআরএ, তাতেও মেলেনি সুরাহা। এমন বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী গ্রাহকের সঙ্গে আলাপ হয় শীর্ষনিউজের, যাদের অধিকাংশেরই ৫ থেকে ৬ বছর আগেই পলিসি পরিপক্ক হয়েছে।
বিমা দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। ২০২৫ সাল শেষে কোম্পানিটিতে ৩ হাজার ২২৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বকেয়া পড়ে রয়েছে। অর্থাৎ জীবন বিমা খাতের মোট বকেয়া দাবির ৭০ দশমিক ৩০ শতাংশই এই কোম্পানির। ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৬ লাখ ২৪ হাজার ৬৯২ জন গ্রাহক ৩ হাজার ৪৪২ কোটি ২৮ লাখ টাকার দাবি উত্থাপন করেন। এর বিপরীতে কোম্পানিটি ৫৮ হাজার ২১৫ জন গ্রাহকের ২১৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। অর্থাৎ কোম্পানিটিতে ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৪৭৭ জন গ্রাহকের ৩ হাজার ২২৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বকেয়া পড়ে রয়েছে। বকেয়া পড়ে থাকা দাবির হার ৯৪ শতাংশ।
ফারইস্ট লাইফের আর্থিক প্রতিবেদনের সবচেয়ে আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে এর ‘লাইফ ফান্ড’ বা বিমা তহবিলে। বর্তমানে কোম্পানিটির লাইফ ফান্ড বা বিমা তহবিল ৮৪৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ঋণাত্মক। সাধারণত গ্রাহকদের প্রিমিয়ামের টাকা দিয়ে এই তহবিল গঠিত হয়, যা থেকে পরবর্তীতে দাবি মেটানো হয়। তহবিল ঋণাত্মক হওয়ার অর্থ হলো, গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ করার মতো পর্যাপ্ত নগদ অর্থ বা সম্পদ কোম্পানিটির হাতে নেই। বর্তমানে কোম্পানিটির মোট সম্পদের পরিমাণ ৩ হাজার ১৬২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং বিনিয়োগ রয়েছে ১ হাজার ৮৪৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
এসব বিষয়ে জানতে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আবদুর রহিম ভূইয়া শীর্ষনিউজ ডটকমকে বলেন, ব্যবসা কমে যাওয়ার কারণে ম্যাচিউরিটি অনেক বেড়ে গেছে। কোম্পানির খরচ কমানোর জন্য অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মূল থিম হলো ব্যবসা, এটা কমে গেলে ব্যয় বেড়ে যায়। কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ব্যবসা বাড়ানোর জন্য অনেক চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে শীর্ষে আরও যেসব বিমা কোম্পানি
আইডিআরএ’র তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৫ সালে ২০টি জীবন বিমা কোম্পানি ব্যবস্থাপনা খাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেছে ১৩২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। আইন লঙ্ঘন করে বছরটিতে ব্যবস্থাপনা খাতে সব থেকে বেশি অর্থ ব্যয় করেছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ। প্রতিষ্ঠানটি ২৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। আইন অনুযায়ী, ব্যবস্থাপনা খাতে কোম্পানিটির সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা ছিল ৫২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। অথচ ব্যয় করা হয়েছে ৮০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এর পরের স্থানেই রয়েছে শান্তা লাইফ। কোম্পানিটি অতিরিক্ত ব্যয় করেছে ১৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা খাতে সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। বিপরীতে ব্যয় করা হয়েছে ১৬ কোটি ২২ লাখ টাকা।
আইন লঙ্ঘন করে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করার তালিকায় রয়েছে প্রোগ্রেসিভ লাইফও। কোম্পানিটি আইন লঙ্ঘন করে ১০ কোটি ৮০ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। আইন অনুযায়ী, কোম্পানিটির সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা ছিল ১৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। কিন্তু ব্যয় হয়েছে ২৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। একইভাবে এনআরবি ইসলামী লাইফের সর্বোচ্চ ব্যয় সীমা ১৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা নির্ধারিত হলেও কোম্পানিটি ২৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। অর্থাৎ অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। প্রোটেক্টিভ লাইফের সর্বোচ্চ ব্যয় সীমা ৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা নির্ধারিত হলেও কোম্পানিটি ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। এ হিসাবে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা।
এছাড়া চার্টার্ড লাইফ ৮ কোটি ৪৭ লাখ, জেনিথ ইসলামী লাইফ ৬ কোটি ৬১ লাখ, সান লাইফ ৬ কোটি ২৩ লাখ, স্বদেশ লাইফ ৬ কোটি ৫ লাখ, হোমল্যান্ড লাইফ ৫ কোটি ৯১ লাখ, সোনালী লাইফ ৫ কোটি ৩৪ লাখ, যমুনা লাইফ ৫ কোটি ৩৩ লাখ, পদ্মা ইসলামী লাইফ ৪ কোটি ৬৬ লাখ, গোল্ডেন লাইফ ৩ কোটি ৩৮ লাখ, বায়লা লাইফ ২ কোটি ৫৮ লাখ, লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ ২ কোটি ৪১ লাখ, সানফ্লাওয়ার লাইফ ১ কোটি ৩৭ লাখ এবং ডায়মন্ড লাইফ ১ কোটি ২৪ লাখ টাকা আইন লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত ব্যয় করেছে।
আইন অনুযায়ী, বছরটিতে চার্টার্ড লাইফের ৩০ কোটি ৩৯ লাখ, জেনিথ ইসলামী লাইফের ২৫ কোটি ৫৭ লাখ, সান লাইফের ৩ কোটি ৫৩ লাখ, স্বদেশ লাইফের ১০ কোটি ৭৯ লাখ, হোমল্যান্ড লাইফের ৪ কোটি ১২ লাখ, সোনালী লাইফের ৩৭৮ কোটি ৬৩ লাখ, যমুনা লাইফের ১৭ কোটি ৩৬ লাখ, পদ্মা ইসলামী লাইফের ৮ কোটি ৮৫ লাখ, গোল্ডেন লাইফের ১১ কোটি ৮৫ লাখ, বায়লা লাইফের ৬ লাখ, লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের ৮ কোটি ২৪ লাখ, সানফ্লাওয়ার লাইফের ৪ কোটি ৮৭ লাখ এবং ডায়মন্ড লাইফের ১০ কোটি ১ লাখ টাকা সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা নির্ধারিত ছিল। এসব বিষয়ে কথা বলতে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমিকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।









