শিরোনাম
দেড় মাস পর ডলার কিনলো বাংলাদেশ ব্যাংক বীমা শিল্পে ‘অদম্য নিষ্ঠাবান’ এস এম নুরুজ্জামানের জন্মদিন ইউসিবি-এসএমই ফাউন্ডেশনের চুক্তি, ক্ষুদ্র শিল্পে ৮ শতাংশ হারে ঋণ মিলবে ভ্যাট রিটার্ন জমার সময় বাড়ল ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত এপ্রিলের দুই সপ্তাহে এল ১৯৬০৫ কোটি টাকার প্রবাসী আয় বিশ্ববাজারে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো কমল জ্বালানি তেলের দাম ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ৪৮১ ‘ভুয়া’ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি বাতিল: সংসদে মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী জ্বালানি চাহিদা মেটাতে উন্নয়ন অংশীদারদের কাছে ২০০ কোটি ডলার সহায়তা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়িক সাফল্যে বিশেষ অবদান রাখায় ওয়ালটনের ১৮৮ প্লাজা ও কর্মকর্তা পুরস্কৃত সাউথইস্ট ব্যাংক পিএলসি’র কাওরান বাজার শাখা নতুন ঠিকানায় স্থানান্তর

ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন পাস: ‘লুটপাটকারীদের’ মালিকানায় ফেরার সুযোগ!

  • Update Time : Sunday, April 12, 2026
সংসদে

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ’ এখন সংসদে পাস হয়ে স্থায়ী আইনে পরিণত হয়েছে। তবে, এই আইনে নতুন একটি ধারা যুক্ত হওয়ায় শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। 

নতুন এই বিধান অনুযায়ী, একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকগুলোর সাবেক শেয়ারহোল্ডার বা মালিকরা চাইলে আবারও সেই ব্যাংকের মালিকানায় ফেরার সুযোগ পাবেন। এতে সাধারণ মানুষের মনে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ, যাদের অনিয়ম আর লুটপাটের কারণে একসময় ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হওয়ার পথে বসেছিল, এই আইনের ফলে সেই বিতর্কিত মালিকরাই আবারও ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে আসার আইনি পথ পেয়ে গেলেন।

সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত বিষয় হলো, মালিকানা ফিরে পেতে সাবেক মালিকদের পুরো অর্থ পরিশোধ করতে হবে না। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এসব ব্যাংকের সংকট কাটাতে যে পরিমাণ আর্থিক সহায়তা দিয়েছে, তার মাত্র ৭.৫ শতাংশ জমা দিয়েই তারা পুনরায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই শিথিল শর্তের ফলে নামমাত্র অর্থ খরচ করেই পুরোনো অনিয়মকারীদের জন্য ব্যাংকের দরজা আবারও উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো।

পাস হওয়া নতুন বিলের ১৮ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইন কিংবা এ আইনের অন্যান্য বিধানে যা কিছু থাকুক না কেন, ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর আওতায় তালিকাভুক্ত হওয়ার আগের শেয়ার ধারক অথবা শেয়ার ধারকেরা অথবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে উপযুক্ত বিবেচিত ব্যক্তি ওই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ-দায় পুনরায় ধারণ বা ধারণ করার জন্য রেজোল্যুশন কর্তৃপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবর আবেদন করতে পারবেন। তবে, শেয়ার পুনরায় ধারণের আবেদন করার ক্ষেত্রে পৃথক অঙ্গীকারনামা দিতে হবে।

যেসব অঙ্গীকার করতে হবে তার মধ্যে আছে— ক. রেজোল্যুশনভুক্ত হওয়ার আগে বা পরে সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সব অর্থ পরিশোধ করে ব্যাংক পরিচালনায় ইচ্ছা প্রকাশ। খ. বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত নতুন মূলধন জোগান ও বিদ্যমান মূলধন ঘাটতি পূরণের মাধ্যমে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। গ. সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্য সরকারি, বিধিবদ্ধ সংস্থা বা আধা সরকারি উৎস থেকে দেওয়া ঋণ, ঋণের সুদ অথবা মুনাফা, ইকুইটি, গ্যারান্টি, সব ধরনের আর্থিক সহায়তা বা অন্যান্য সুবিধা সম্পূর্ণ ফেরত দেওয়া। ঘ. একীভূত হওয়ার আগের আমানতকারী, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক পাওনাদার এবং তৃতীয় পক্ষের বৈধ দাবি ও দায়সমূহ যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করা। ঙ. সরকারের সব কর এবং করবহির্ভূত রাজস্ব ও অন্যান্য আর্থিক দায় সম্পূর্ণরূপে পরিশোধ করা।

এই ধারার উপধারা (৩)-এ বলা হয়েছে, আবেদন চূড়ান্তভাবে মঞ্জুরের তিন মাসের মধ্যে পূর্ববর্তী শেয়ার, সম্পদ-দায় পুনরায় ধারণ বা ধারণের বাস্তবিক দখল হস্তান্তরের আগে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে যে পরিমাণ অর্থ জমা দেওয়া হয়েছে, তার সাড়ে ৭ শতাংশের পে-অর্ডার দিতে হবে।

উপধারা (৪) অনুযায়ী, সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া বাকি সাড়ে ৯২ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তরের দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ হারে সরল সুদসহ ফেরত দেবে।

অধ্যাদেশের মূল কাঠামোর বেশিরভাগ অংশই কোনো পরিবর্তন ছাড়াই নতুন বিলে পাস হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— বাংলাদেশ ব্যাংকের রেজোল্যুশন কর্তৃত্ব, প্রশাসক নিয়োগ, মূলধন বৃদ্ধি, তৃতীয় পক্ষের কাছে সম্পদ ও দায় হস্তান্তর, ব্রিজ ব্যাংক, সরকারি সহায়তা, রেজোল্যুশন তহবিল, অবসায়ন ও দায়ী ব্যক্তি চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই আইনের কারণে আগের মালিকেরা খুব সহজেই আবার ব্যাংকের মালিক হতে পারবেন। কারণ, সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক যে মোট টাকা দিয়েছে, তার মাত্র ৭.৫ শতাংশ জমা দিলেই তারা নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারেন। আর আমাদের দেশে একবার কেউ মালিকানা পেলে পরে তাকে সরানো কঠিন হয়।

শুরুর দিকে বিরোধী দল কোনো পরিবর্তন ছাড়াই আইনটি পাসে রাজি ছিল। কিন্তু পরে বিষয়টি ভালোভাবে দেখার জন্য একটি কমিটি করা হয়। গত ১ এপ্রিল ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়, যেখানে অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ছিলেন।

আগের অধ্যাদেশে ৯৮টি ধারা ছিল, যা কমিয়ে ৭৪টি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কম গুরুত্বপূর্ণ ২৪টি ধারা বাদ দিয়ে পরে আলাদা নিয়মে রাখার কথা বলা হয়, যাতে আইনটি সহজ হয়। এছাড়া, কিছু ভুল-ত্রুটি ঠিক করে সংশোধিত খসড়া সরকারকে দেওয়া হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, সবচেয়ে বিতর্কিত ১৮ (ক) ধারাটি আগে ছিল না; সংসদে তোলার আগেই এটি নতুন করে যোগ করা হয়েছে।

কমিটির কয়েকজন সদস্য জানিয়েছেন, কমিটি গঠনের পর থেকে একটি পক্ষ এই ধরনের ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব দেয়। তবে, অধিকাংশ সদস্য এতে আপত্তি জানান, তাই চূড়ান্ত খসড়ায় এটি রাখা হয়নি। কিন্তু বিল পাসের ঠিক আগে, ৯ এপ্রিল রাতে এই ধারা যুক্ত করার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক জানতে পারে। পরের দিন সকালে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়কে এটি না করার অনুরোধ জানায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, যদি নতুন এই ধারাটি যোগ করতেই হতো, তবে সেখানে আরও কঠোর শর্ত থাকা প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে যাদের কারণে ব্যাংকগুলো সংকটে পড়েছে, তাদের মালিকানায় ফেরার পথ চিরতরে বন্ধ রাখার প্রস্তাব ছিল তাদের। পাশাপাশি মালিকানা ফিরে পাওয়ার আগে আমানতকারীর টাকা, সরকারি সহায়তা এবং অন্যান্য সব দেনা পুরোপুরি পরিশোধ করার বাধ্যবাধকতা রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই কঠোর শর্তগুলো রাখা হয়নি; বরং কেবল দায় পরিশোধের একটি প্রতিশ্রুতি (অঙ্গীকারনামা) দিয়েই আগের শেয়ার ফেরত পাওয়ার সুযোগ আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বিতর্কিত ধারাটি ছাড়া বাকি অংশে আগের অধ্যাদেশের মূল কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রেখেই আইনটি পাস করা হয়েছে। আইনে বাংলাদেশ ব্যাংককে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক সামাল দিতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— প্রয়োজনে প্রশাসক নিয়োগ করা, ব্যাংকের মূলধন বাড়ানো, সম্পদ ও দায় অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা, অস্থায়ীভাবে ‘ব্রিজ ব্যাংক’ গঠন করা এবং সরকারি সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা। এছাড়া, একটি আলাদা রেজোল্যুশন তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে কোনো ব্যাংক বন্ধ (অবসায়ন) করে দেওয়া এবং এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।

আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী— এই পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়। এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংক নাসা গ্রুপের কর্ণধার নজরুল ইসলাম মজুমদারের নেতৃত্বে পরিচালিত হতো এবং বাকি চারটি ব্যাংক ছিল এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে।

ব্যাংক একীভূত করার এই উদ্যোগ শুরুর পর থেকেই নানা বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। তবে, সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে অন্তর্বর্তী সরকার সেসব বিতর্ককে ছাপিয়ে নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এবং শেষ পর্যন্ত ব্যাংকটিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে আসে। গত বছরের নভেম্বরে প্রশাসকরা আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন ব্যাংকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

নতুন ব্যাংকটি মোট ৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। আমানতকারীদের মধ্যে বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল দেওয়া হবে। এছাড়া, প্রায় ৭৮ লাখ আমানতকারীর আমানত বীমা তহবিল থেকে দুই লাখ টাকা করে মোট ১২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2026 pujibazarpratidin
Site Customized By NewsTech.Com