বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় চাপে ব্যাংক খাত

  • Update Time : Sunday, May 24, 2026

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ ব্যাংকই আগামীতে শেয়ারহোল্ডারদের নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা নতুন নির্দেশনার ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে ৩৫টিই নগদ লভ্যাংশ ঘোষণার বাইরে চলে যেতে পারে।

শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রব স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এ তথ্য জানানো হয়। দেশের ব্যাংক খাতের সার্বিক পরিস্থিতি, আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা, ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা এবং বিনিয়োগকারীদের রিটার্ন বিবেচনায় এনে এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে পুঁজিবাজারে ৩৬টি ব্যাংক তালিকাভুক্ত রয়েছে। নতুন সার্কুলার অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন (Paid-up Capital) ২ হাজার কোটি টাকার কম হলে তারা কোনো ধরনের নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না।

ডিএসইতে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে মাত্র দুটি ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকার বেশি। ব্যাংক দুটি হলো ব্র্যাক ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক। তবে অতিরিক্ত খেলাপি ঋণের (এনপিএল) কারণে ন্যাশনাল ব্যাংকও নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ হারাতে পারে। ফলে নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যত শুধু ব্র্যাক ব্যাংকই নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা রাখছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ১৩ মার্চ ২০২৫ তারিখে জারিকৃত ডিওএস সার্কুলার নং-০১ এবং ১৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে জারি করা এসপিসিডি সার্কুলার নং-০৫ অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর লভ্যাংশ বিতরণ সংক্রান্ত নীতিমালা কার্যকর রয়েছে। ওই নীতিমালার আওতায় লভ্যাংশ ঘোষণার জন্য ব্যাংকগুলোকে কিছু অত্যাবশ্যকীয় শর্ত পরিপালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফারসহ ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণ হারের ভিত্তিতে নগদ ও স্টক লভ্যাংশ প্রদানের সীমা এবং সর্বোচ্চ “লভ্যাংশ প্রদান অনুপাত” (Dividend Payout Ratio) নির্ধারণ করা হয়।

নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতের মূলধন ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে লভ্যাংশ ঘোষণার ক্ষেত্রে নতুন কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব ব্যাংক সব শর্ত যথাযথভাবে পরিপালন করে নগদ লভ্যাংশ প্রদানে সক্ষম হবে, তারা ঘোষিত মোট লভ্যাংশের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ করতে পারবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এ নির্দেশনা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ সমাপ্ত অর্থবছর এবং পরবর্তী বছরগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণার ক্ষেত্রে কার্যকর হবে। পাশাপাশি ১৩ মার্চ ২০২৫ তারিখে জারি করা ডিওএস সার্কুলার নং-০১ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সার্কুলারের সব নির্দেশনা আগের মতোই বহাল থাকবে।

১৩ মার্চ ২০২৫ সালে জারি করা ডিওএস সার্কুলার নং-০১-এ ব্যাংকগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণায় বেশ কিছু কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—

কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ (এনপিএল) মোট ঋণের ১০ শতাংশের বেশি হলে তারা লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে না।
ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) ও স্ট্যাটিউটরি লিকুইডিটি রেশিও (এসএলআর) ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো জরিমানা বা বকেয়া থাকলে লভ্যাংশ দেওয়া যাবে না।
ঋণ ও বিনিয়োগের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ঘাটতি থাকলে কিংবা প্রভিশন সংক্রান্ত ডেফারেল সুবিধা নিলে লভ্যাংশ ঘোষণা নিষিদ্ধ করা হয়।

নগদ লভ্যাংশ কেবল চলতি বছরের মুনাফা থেকে দেওয়া যাবে; আগের বছরের জমাকৃত মুনাফা (Retained Earnings) থেকে নগদ লভ্যাংশ দেওয়া যাবে না।

ব্যাংকগুলোর মূলধন সংরক্ষণ হার (Capital Conservation Buffer) ও ন্যূনতম মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখার ভিত্তিতে লভ্যাংশের সীমা নির্ধারণ করা হয়।

সব শর্ত পূরণ করলেও “লভ্যাংশ প্রদান অনুপাত” (Dividend Payout Ratio)-এর ওপর সীমা আরোপ করা হয়, যাতে অতিরিক্ত মুনাফা বিতরণের পরিবর্তে ব্যাংকের মূলধন শক্তিশালী করা যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা তখন বলেছিলেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনা, মূলধন ঘাটতি কমানো এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়াতেই এ কঠোর নীতিমালা আনা হয়েছে। এর ফলে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে না পারার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন লভ্যাংশ নীতিমালাকে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করছেন, দীর্ঘ সময় নগদ লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বেশিরভাগ ব্যাংকের মূলধন ভিত্তি এখনও দুর্বল। খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি এবং তারল্য সংকটের কারণে অনেক ব্যাংক প্রকৃত অর্থে নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার অবস্থায় নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই বাস্তবতা বিবেচনায় এনে মূলধন সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে ব্যাংকগুলোর মূলধন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। অতীতে অনেক ব্যাংক দুর্বল আর্থিক অবস্থার মধ্যেও লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, যা ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক চিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নতুন নির্দেশনা সেই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, তালিকাভুক্ত অধিকাংশ ব্যাংক নগদ লভ্যাংশ দিতে না পারলে ব্যাংক খাতের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যেতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক শেয়ারে মূলত স্থিতিশীল ডিভিডেন্ড আয়ের আশায় বিনিয়োগ করে থাকেন। ফলে নগদ লভ্যাংশ সীমিত হলে বাজারে নেতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়তে পারে।

তাদের ভাষ্য, শুধুমাত্র স্টক লভ্যাংশ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের সন্তুষ্ট রাখা কঠিন হবে। এ কারণে দুর্বল ব্যাংকগুলোর সুশাসন, ঋণ পুনরুদ্ধার এবং মূলধন ব্যবস্থাপনায় দ্রুত সংস্কার আনা প্রয়োজন।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা আরও মনে করছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে এক ধরনের শৃঙ্খলা তৈরি করবে। যেসব ব্যাংক আর্থিকভাবে শক্তিশালী, তারাই ভবিষ্যতে নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে—এমন বার্তা বাজারে ইতিবাচক প্রভাবও ফেলতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, শুধু লভ্যাংশ সীমিত করলেই ব্যাংক খাতের সমস্যা সমাধান হবে না। খেলাপি ঋণ কমানো, করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা এবং দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2026 pujibazarpratidin
Site Customized By NewsTech.Com