ঋণ অনিয়ম ও আর্থিক সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেডকে আবারও বিশেষ আর্থিক সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এবার রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে ৩১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৬১ মার্কিন ডলার বৈদেশিক ঋণ ছাড় এবং নতুন ঋণপত্র (এলসি) খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) জারি করা এক আদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ অনুমোদন দেয়। এতে আগের একটি সিন্ডিকেট ঋণের আওতায় রূপালী ব্যাংকে থাকা অবশিষ্ট অর্থ এসএস পাওয়ার-১-কে ছাড় করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যাংক কোম্পানি আইনের একটি বিধান থেকে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে।
দেশের সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো নির্দেশনায় বলা হয়, এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেডের অনুকূলে রূপালী ব্যাংকের অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রার সিন্ডিকেটেড ঋণের অবশিষ্ট ৩১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৬১ ডলার ছাড় এবং নতুন এলসি খোলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত রোববারও প্রতিষ্ঠানটির জন্য এলসি খোলার অনুরূপ অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহাম্মদ স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১২১ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেডের অনুকূলে রূপালী ব্যাংকের ঋণ ছাড় ও এলসি খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৭ কক(৩) ধারার বিধান কার্যকর হবে না।
তবে এ ঋণসুবিধার ক্ষেত্রে বিশেষ শর্ত আরোপ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এ ঋণসুবিধার বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো দায় সৃষ্টি হবে না। ভবিষ্যতে রূপালী ব্যাংক এই এলসির বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তাও দাবি করতে পারবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রামের বাঁশখালীর এসএস পাওয়ার-১ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বর্তমানে চালু রয়েছে এবং জাতীয় গ্রিডে নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। কাঁচামালের সংকট দেখা দিলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা জাতীয় গ্রিডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখার স্বার্থেই এস আলম গ্রুপ ঋণখেলাপি হওয়া সত্ত্বেও এসএস পাওয়ার-১-কে এই বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানান কর্মকর্তারা। তারা আরও জানান, অতীতেও জনস্বার্থ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন অব্যাহত রাখার স্বার্থে বিভিন্ন কোম্পানিকে এ ধরনের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত ১৬ আগস্টও বাংলাদেশ ব্যাংক একই প্রতিষ্ঠানের জন্য আইনি ছাড় দিয়ে শতভাগ নগদ মার্জিন সুবিধায় এলসি খোলার অনুমোদন দেয়। পরপর দুই দফা বিশেষ ছাড় দেওয়ার ঘটনায় ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ দীর্ঘদিন দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বৃহৎ ঋণগ্রহীতা হিসেবে পরিচিত। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গ্রুপটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণ অনিয়ম, অর্থ পাচার ও ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত শুরু করে।
তদন্ত ও মামলা-মোকদ্দমার প্রেক্ষাপটে নতুন ঋণপ্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেলে গ্রুপটির অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ইতোমধ্যে গ্রুপটির ১১টি শিল্পকারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমানে গ্রুপটির বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতের ব্যবসা সীমিত পরিসরে চললেও ভোগ্যপণ্য ও উৎপাদনমুখী অনেক প্রতিষ্ঠান সংকটে রয়েছে।
এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেড চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে স্থাপিত একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করে। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী এই কেন্দ্রটির সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন সম্পর্ক রয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন অব্যাহত রাখতে জ্বালানি আমদানি, যন্ত্রাংশ সংগ্রহ এবং বিদেশি দেনা পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ ছাড় দিয়ে থাকতে পারে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারা এলাকায় এস আলম গ্রুপ ও চীনের দুটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মিত হয়েছে। প্রকল্পে এস আলম গ্রুপের ৭০ শতাংশ মালিকানা রয়েছে। বাকি ৩০ শতাংশের মালিক চীনের সেপকো থ্রি ও এইচটিজি ডেভেলপমেন্ট গ্রুপ। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিটের মাধ্যমে কেন্দ্রটি বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে-বেনামে নেওয়া ঋণের পরিমাণ বর্তমানে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি, যার একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে খেলাপি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, খেলাপি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কোনো ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ বা এলসি খোলার সুযোগ থাকে না। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখার প্রয়োজন বিবেচনায় এসএস পাওয়ার-১-এর ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।