দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে ‘ক্ষতিকর’ মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি জিয়াউল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
এর আগে বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চে রিট আবেদন করেন। পরে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চান। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের আবেদন করা হবে।
গত রোববার (২৬ জুলাই) রাজধানীর লালমাটিয়ায় এসডোর প্রধান কার্যালয়ে দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্ট নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণার প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
সংস্থাটি জানায়, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশব্যাপী একটি সমন্বিত গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে। এতে ভোক্তা জরিপ, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং নিয়ন্ত্রক ও বৈজ্ঞানিক বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার অন্তর্ভুক্ত ছিল, যাতে বাস্তব পরিস্থিতি ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে মূল্যায়ন করা যায়।
গবেষণাটি পরিচালনা করা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ‘এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি (ইএইচই)’ ল্যাবরেটরিতে। সেখানে স্টিরিওমাইক্রোস্কোপি ও ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি প্রযুক্তি ব্যবহার করে ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষা করা ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। বাকি ৮টিতে কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
পরীক্ষা করা টুথপেস্টগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে উৎপাদিত পণ্য ছিল। বাংলাদেশের ২৫টি নমুনার মধ্যে ২২টিতে, ভারতের ৫টির মধ্যে একটিতে, থাইল্যান্ডের ২টির মধ্যে একটিতে এবং ভিয়েতনামের ২টির দুটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, দেশে তৈরি ও আমদানি করা উভয় ধরনের টুথপেস্টেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুদের জন্য বাজারজাত করা ৬টি টুথপেস্টের মধ্যে ৪টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এসব নমুনায় প্রতি ১০০ গ্রামে ২০ থেকে ১৪০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পরীক্ষা করা কোনো টুথপেস্টের মোড়ক বা লেবেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা কৃত্রিম পলিমার ব্যবহারের তথ্য উল্লেখ ছিল না। ফলে ভোক্তারা পণ্যে কী উপাদান রয়েছে তা জানতে পারছেন না, একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পক্ষেও কার্যকর নজরদারি কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের বড় উদ্বেগের বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে। বাংলাদেশে এ ধরনের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আসায় এটি ভবিষ্যতে নিরাপদ টুথপেস্টের মানদণ্ড নির্ধারণ, নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।