বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসইভিপি) মো. দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এর আগে তিনি এনআরবিসি ব্যাংকের উত্তরা শাখার ব্যবস্থাপক ছিলেন। শাখাটিতে অন্তত ২৩২ কোটি টাকার জালিয়াতিতে তার সম্পৃক্ততা পাওয়ার পর ২০২২ সালে তাকে চাকরি থেকে অপসারণ বা বরখাস্তের সুপারিশ করা হয়েছিল।
এরপর এনআরবিসি ব্যাংকের ছাড়পত্র না নিয়েই ২০২৩ সালের মার্চে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে যোগ দেন দেলোয়ার হোসেন। যোগদানের সময় এনআরবিসি ব্যাংকে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক বা শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা চলমান নেই এবং কোনো মামলা বিচারাধীন নেই বলে অঙ্গীকার করেছিলেন তিনি। ছয় মাসের মধ্যে এনআরবিসি ব্যাংকের অব্যাহতিপত্র জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমার্স ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত তার আবেদনে ব্যাংকের সাসপেন্স হিসাব থেকে ১১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এসব অর্থ বিভিন্ন খরচের খাতে সমন্বয় দেখানো হলেও ভাউচার নিরীক্ষা করা হয়নি এবং আর্থিক ক্ষমতাও অনুসরণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ‘উজ্জীবন আমানত ক্যাম্পেইন-২০২৬’-এর নামে ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তাকে দেওয়া ৪ কোটি টাকা প্রণোদনার তালিকাতেও দেলোয়ার হোসেনের নাম রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এনআরবিসিতে ২৩২ কোটি টাকার জালিয়াতির অভিযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এনআরবিসি ব্যাংকের উত্তরা শাখার ব্যবস্থাপক থাকা অবস্থায় দেলোয়ার হোসেন ঋণ বিতরণ এবং আমদানি-রপ্তানিতে নন-ফান্ডেড ঋণের ক্ষেত্রে গ্রাহককে অবৈধ সুবিধা দিয়েছেন। ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত উত্তরা শাখার কার্যক্রম পরিদর্শন করে এসব অনিয়মের তথ্য পায় বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শাখাটির গ্রাহক মেসার্স বেক নিট ২০১৯ সালের এপ্রিলে ৮ হাজার ৪১৯ ডলারের পণ্য জাহাজীকরণ করে। চার মাস পরও রপ্তানি আয় দেশে আসেনি। এ বিষয়ে ১৪ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি।
বরং মেয়াদোত্তীর্ণ রপ্তানি বিলের তথ্য গোপন করে ৫৭টি কেসের বিপরীতে গ্রাহককে ৪ কোটি ৮৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। একইভাবে আরও দুটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২ কোটি টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৩ সালের ১১ জুলাই দেলোয়ার হোসেনসহ নয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলায় ৭৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাৎ এবং যুক্তরাজ্যে ৭ লাখ ৩ হাজার ৯৫ ডলার মূল্যের সোয়েটার রপ্তানির অর্থ দেশে না এনে অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়। মামলাটি এখনো চলমান।
এনআরবিসি ব্যাংকের একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। এতে বলা হয়, শাখা ব্যবস্থাপক থাকা অবস্থায় অন্তত ২৩২ কোটি টাকার জালিয়াতিতে তার সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। এ কারণে ২০২২ সালে তাকে চাকরি থেকে অপসারণ বা বরখাস্তের সুপারিশ করা হয়। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করে নিরীক্ষা দল।
এর মধ্যে ২০২২ সালের ৫ ডিসেম্বর দেলোয়ার হোসেন পদত্যাগ করেন। তবে ১২ দিন পর, ১৮ ডিসেম্বর, এনআরবিসি ব্যাংক তাকে জানায়, শাখার বিভিন্ন জালিয়াতিতে সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা সম্ভব নয়।
ছাড়পত্র ছাড়াই কমার্স ব্যাংকে যোগদান
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনআরবিসি ব্যাংক থেকে কোনো ছাড়পত্র না নিয়ে ২০২৩ সালের ২৭ মার্চ ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামার ভিত্তিতে কমার্স ব্যাংকে যোগ দেন দেলোয়ার হোসেন।
অঙ্গীকারনামায় তিনি উল্লেখ করেন, এনআরবিসি ব্যাংকে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক বা শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন নেই। বাংলাদেশের কোনো আদালতে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা বিচারাধীন নেই। কমার্স ব্যাংকে যোগদানের ছয় মাসের মধ্যে এনআরবিসি ব্যাংক থেকে অব্যাহতিপত্র এনে জমা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
কিন্তু সেই অব্যাহতিপত্র তিনি জমা দেননি বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাসপেন্স হিসাব থেকে ১১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত দেলোয়ার হোসেনের আবেদনে কমার্স ব্যাংক থেকে ১১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা উত্তোলন দেখানো হয়। সাসপেন্স হিসাব থেকে টাকা উত্তোলনের পর বিভিন্ন খরচের খাতে ডেবিট করে তা সমন্বয় দেখানো হয়। এ ক্ষেত্রে ভাউচার নিরীক্ষা করা হয়নি এবং আর্থিক ক্ষমতা অনুসরণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এর মধ্যে ‘ইন্টারেস্ট অব এজেন্ট কমিশন’ খাতে ৩২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য খাতে ১২ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। সাসপেন্স খাত থেকে নেওয়া ৭৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার কোনো ভাউচার দেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া ২০২৩ সালের ১৪ অক্টোবর সান্ড্রি খাত থেকে ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং ৭ নভেম্বর ১৮ লাখ ১১ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। এক দিন পর ব্যাংকটির খাতুনগঞ্জ শাখার মাধ্যমে এসব অর্থ সমন্বয় করা হয়। এসব লেনদেনের বিষয়ে শাখা থেকে যৌক্তিক কোনো জবাব দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এসব লেনদেনকে সন্দেহজনক এবং অর্থ পাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে প্রতীয়মান হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
৪ কোটি টাকা প্রণোদনার তালিকায়
‘উজ্জীবন আমানত ক্যাম্পেইন-২০২৬’-এর নামে কমার্স ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তাকে ৪ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়ার ঘটনাতেও দেলোয়ার হোসেনের নাম রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৪টি চেকের মাধ্যমে ওই কর্মকর্তারা টাকা উত্তোলন করেন। এর মধ্যে চলতি বছরের ৪ জুন নয়টি চেকে ৩ কোটি ৪ লাখ টাকা এবং ৭ জুন পাঁচটি চেকে ৯৬ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়।
পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কমার্স ব্যাংকের প্রধান শাখায় আনা আরও ৫ কোটি টাকা তারা নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ওই ৫ কোটি টাকা তিনটি পাটের বস্তায় শাখায় এনে পরে ছয়টি বস্তায় প্যাকেট করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দুই কর্মকর্তাকে টাকা নিয়ে শাখা ত্যাগ করতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সভায় ‘উজ্জীবন’ কর্মসূচির আওতায় ২৭০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা নতুন আমানত সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কর্মসূচির মেয়াদ ছিল চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল থেকে ১৪ মে পর্যন্ত। পরে তা ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হলেও বাড়তি সময়ের জন্য পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছিল না। পরে ১৩ কর্মকর্তাকে ১০০ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহের বিপরীতে মোট ৪ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ৪ টাকা করে প্রণোদনা দেওয়া হয়।
প্রণোদনা পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে এমডির পিএস মো. হামিদুর রহমান ৮০ লাখ টাকা, এফএভিপি মোহাম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক উল্লাহ ৮০ লাখ টাকা, এভিপি সালেহ আহমেদ ২০ লাখ টাকা, অফিসার মো. সরোয়ার ৮ লাখ টাকা এবং এফএভিপি সুজন দাস ৮ লাখ টাকা পান। এভিপি তাশনুভা মজুমদার, মো. আহসান হাবীব ও পিও মো. আদনান শফিক প্রত্যেকে ৪০ লাখ টাকা করে পান। আরও রয়েছেন মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, মো. মনিরুল হক, রিফাতুল মুরসালিন, সাইফুর রহমান ও শাহিনুর রহমান।
যা বললেন দেলোয়ার
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সবই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। সব কিছু উদ্দেশ্যমূলকভাবে করা হয়েছে।’
এনআরবিসি ব্যাংকের অনিয়মের তথ্য গোপন করে কমার্স ব্যাংকে চাকরি করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি হাইকোর্টের অর্ডার নিয়ে কাজ করতেছি। কোনো তথ্য গোপন করি নাই। আর টাকা আত্মসাতের যে অভিযোগ এনেছে এটা মিথ্যা।’
প্রণোদনার নামে কমার্স ব্যাংকের ৪ কোটি টাকা আত্মসাতের সঙ্গে তার নাম থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এমডি স্যারের নির্দেশে গাড়িতে করে গিয়েছিলাম। এর বেশি আমি কিছু জানি না।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের যারা তদন্ত করেছে তাদের জরিমানা হওয়া উচিত। তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে তদন্ত করেছে।’
দেলোয়ার হোসেনের বক্তব্যের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরি হোসেন খান বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পরই তদন্ত প্রতিবেদনে তার নাম এসেছে। তিনি যদি নির্দোষ হন তাহলে ব্যাংকের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জানাতে হবে যে অমুক কর্মকর্তা নির্দোষ।’
বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়দুল হক বলেন, ‘বিষয়টির আসলে ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। আসল ঘটনা এটা নয়। আপনি কাগজ দেখলেই বুঝতে পারবেন।’
দেলোয়ার হোসেনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তার তদন্ত হচ্ছে।’
সূত্র: বাণিজ্য প্রতিদিন