দীর্ঘদিনের তারল্যসংকট, বিপুল খেলাপি ঋণ ও পুঞ্জীভূত লোকসানে দুর্বল হয়ে পড়া পদ্মা ব্যাংক অবসায়নের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটির পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তনসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও সংকট কাটেনি। ফলে ব্যাংকটি গুটিয়ে ফেলা ছাড়া কার্যকর কোনো পথ দেখছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
পদ্মা ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গেল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে পদ্মা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। তবে ব্যাংকটিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার মতো বাস্তবসম্মত কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। এরপরই ব্যাংকটি অবসায়নের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
চলতি মাসেই অবসায়নের প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন মিললে ব্যাংকিং রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পদ্মা ব্যাংক বন্ধের কার্যক্রম শুরু হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো ব্যাংক অবসায়নের ঘটনা ঘটবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, পদ্মা ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় এর দায়িত্ব বা নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইবে না। ব্যাংকটির মন্দ ঋণ, পুঞ্জীভূত লোকসান ও মূলধন ঘাটতি এতটাই বেশি যে সাধারণ প্রক্রিয়ায় এসব সমস্যা কাটিয়ে ওঠা কঠিন। ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখা কিংবা অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করাও অত্যন্ত কঠিন। সবদিক বিবেচনায় অবসায়ন ছাড়া বিকল্প নেই।
বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পারা, বিপুল খেলাপি ঋণ এবং দীর্ঘস্থায়ী তারল্যসংকটের কারণে পদ্মা ব্যাংকের কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনা হলেও তারল্য ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনাও দেখাতে পারেনি।
ব্যাংকটির পক্ষ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ডেপুটি গভর্নর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পদ্মা ব্যাংকের দায় আর কতদিন বহন করা হবে, এখন সেই প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান অবস্থায় ব্যাংকটি রাখা হবে না। কোনো ব্যাংকই পদ্মা ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এর আগে এক্সিম ও সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে পদ্মা ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে পদ্মা ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৯০ শতাংশ। আগের বছরের জুনে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৫ হাজার ১৩১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯১ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
ঋণ পুনঃতফসিল ও এক্সিট কর্মসূচির আওতায় কিছু অর্থ আদায় হওয়ায় খেলাপি ঋণের হার সামান্য কমেছে। তবে এতে ব্যাংকটির সামগ্রিক আর্থিক অবস্থার বড় কোনো উন্নতি হয়নি।
ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে পদ্মা ব্যাংকের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা। এর বড় একটি অংশ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার অর্থ। ৪৩টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকটিতে আটকে আছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি), জীবন বীমা করপোরেশন, সাধারণ বীমা করপোরেশন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, তিতাস গ্যাস, বিটিআরসি, মোংলা বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দর।
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড ও সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টের প্রায় ৭৬০ কোটি টাকা পদ্মা ব্যাংকে জমা রয়েছে। এসব অর্থও বছরের পর বছর ফেরত দিতে পারছে না ব্যাংকটি।
২০১৩ সালে ফার্মারস ব্যাংক নামে কার্যক্রম শুরু করে বর্তমান পদ্মা ব্যাংক। প্রতিষ্ঠার মাত্র চার বছরের মধ্যে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ব্যাংকটি সংকটে পড়ে। পরে ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখতে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, নাম পরিবর্তন, মূলধন জোগানসহ বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি ফার্মারস ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করে পদ্মা ব্যাংক করা হয়। একই বছর রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবি মিলে পদ্মা ব্যাংকে ৭১৫ কোটি টাকা মূলধন জোগান দেয়। তবে সেই অর্থও ফেরত আসেনি।
ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান ও সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান বলেন, ব্যাংকটির তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমানত ও মূলধন শেষ হয়ে গেছে। সঞ্চিত লোকসান এখন ব্যাংকটির সম্পদ ও দায়ের পরিমাণকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বর্তমানে পদ্মা ব্যাংকের ৬০টি শাখা, ১৪টি উপশাখা ও ছয়টি এজেন্ট আউটলেট রয়েছে। ব্যাংকটিতে কর্মরত আছেন প্রায় ১ হাজার ৬০০ জন।