শিরোনাম
ক্রেডিট কার্ডে সরাসরি কেনা যাবে বিদেশি এয়ারলাইনসের টিকিট সিগারেটে দাম বাড়িয়েও ৩ হাজার কোটি রাজস্ব ঘাটতি, কারণ খতিয়ে দেখার তাগিদ আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ সভা অনুষ্ঠিত ইউসিবির ‘ভিসা একসেপ্ট’: স্মার্টফোনেই কার্ডের পেমেন্ট নেবেন বিক্রেতারা বাংলা কিউআরে লেনদেনে বড় সুখবর ঢাকার আকাশ আংশিক মেঘলা, রাতে কমতে পারে তাপমাত্রা পটুয়াখালী অঞ্চলে পপুলার লাইফের ২ কোটি ৮৭ লক্ষ ৬২ হাজার টাকার বীমা দাবী পরিশোধ ১২ হাজার কোটি টাকার ডিপোজিট অর্জনের মাইলফলক উদযাপন করেছে মধুমতি ব্যাংক দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ক্ষমতাসীন দলের জন্য অশনিসংকেত: টিআইবি ডিজিটাল উদ্ভাবনে প্রজেক্ট অব দ্য ইয়ার পুরস্কার পেল ইউসিবি

পানামা খালে জাহাজ পারাপারে বাড়ছে রেকর্ড মাশুল, সর্বোচ্চ ৫০ লাখ ডলার

  • Update Time : Saturday, September 26, 2026

বিশ্বজুড়ে নৌপথে পণ্য পরিবহনে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে চলাচল যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি পশ্চিম গোলার্ধে চরম আবহাওয়ার কারণেও জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে পানামা খালে।

সম্প্রতি কয়েকটি বড় পণ্যবাহী জাহাজকে পানামা খাল পার হতে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত দিতে হয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে। তবে বাংলাদেশের বাজারেও তার প্রভাব খুব একটা পড়বে না বলে জানা গেছে।

প্রায় ৫০ মাইল দীর্ঘ পানামা খাল আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৬ শতাংশ পণ্য এই খাল দিয়ে পরিবহন করা হয়। ইরান যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে অনেক জাহাজকে বিকল্প নৌপথে যেতে হচ্ছে, ফলে পানামা খালের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

সম্প্রতি পানামা খালের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া ইলিয়া এসপিনো দে মারোত্তা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কিছু জাহাজকে খাল দিয়ে যাওয়ার জন্য ৪০ থেকে ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত দিতে হয়েছে।’ তাঁর ভাষায়, এই মাশুল রেকর্ড পর্যায়ের। চলতি বছরের গ্রীষ্মে অনুষ্ঠিত নিলামে কোনো কোনো জাহাজের মাশুল উঠেছিল ১০ লাখ ডলারের বেশি। অথচ ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত নিলামে গড় দর ছিল প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার।

প্রশাসক ইলিয়া এসপিনো দে মারোত্তা বলেন, ‘বাজারই দাম ঠিক করে।’ ভবিষ্যতে কোনো কোনো জাহাজের জন্য আবার ২০ লাখ বা ৩০ লাখ ডলারের দর উঠতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

পানামা খাল দিয়ে চলাচলকারী বেশির ভাগ জাহাজই কয়েক মাস আগে চলাচলের আগাম সময় নির্ধারণ করে রাখে। মোট জাহাজ চলাচলের প্রায় ৯০ শতাংশের সূচি এভাবে আগাম সংরক্ষণ করা হয়। খাল দিয়ে জাহাজ পার হওয়ার এই ব্যবস্থা মূলত মিঠাপানির সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। জাহাজে কী ধরনের ও কত পরিমাণ পণ্য আছে, তার ওপর সাধারণত আগাম সংরক্ষণের খরচ নির্ভর করে।

খাল দিয়ে জাহাজ চলাচলের খরচ বেড়ে গেলে শুধু জাহাজভাড়া নয়, শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্য ও ভোক্তা পর্যায়ের পণ্যের দামও বাড়তে পারে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অতটা প্রভাব পড়বে না বলে জানা গেছে। কেননা, বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান গন্তব্য হলো ইউরোপ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি বাণিজ্য বাড়লেও সে দেশে যাওয়ার একাধিক পথ আছে। ফলে পানামা খালের মাশুল বেড়ে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য খুব একটা বড় সমস্যা নয়।

তবে সব সময় আগাম সংরক্ষণ দেওয়া হয় না। কিছু সূচি নিলামের জন্য রেখে দেওয়া হয়, যাতে জরুরি প্রয়োজনে কাছাকাছি সময়ে জাহাজ পার করা যায়। বর্তমানে এসব সূচির নিলাম শুরু হয় এক লাখ ডলার থেকে। চলতি মৌসুমে নিলামে গড় দর ছিল প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার ডলার।

প্রশাসক ইলিয়া এসপিনো দে মারোত্তা বলেন, নির্দিষ্ট দিনে জরুরি ভিত্তিতে খাল পার হতে চাওয়া কিছু জাহাজ অনেক বেশি দর দেয়। সম্প্রতি যে মাশুল ৪০ থেকে ৫০ লাখ ডলারে উঠেছে, তার পেছনে মূলত এই জরুরি প্রয়োজনের বিষয়টি কাজ করেছে।

এলএনজি পরিবহনে গুরুত্ব বাড়ছে

যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূল থেকে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বহনকারী ট্যাংকারগুলো পানামা খাল ব্যবহার করে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের শস্য, চিলির ওয়াইন ও চীনের বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যও এই খাল দিয়ে পরিবহন করা হয়। পানামা খাল সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র, এরপর চীন।

চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত তীব্র হওয়ার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের পথেও পরিবর্তন এসেছে। এশিয়ায় এলএনজির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় বন্দর থেকে এশিয়ার বাজারে গ্যাস পাঠানোর চাপ বেড়েছে।

নরওয়ের অসলোভিত্তিক সামুদ্রিক পরিবহন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান জেনেটার প্রধান বিশ্লেষক পিটার স্যান্ড বলেন, জ্বালানির ঘাটতি প্রতিদিনই বাড়ছে, বিশেষ করে এশিয়ায়।

এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজগুলো সাধারণত আগে থেকেই পানামা খালের সূচি সংরক্ষণ করে না। ফলে জরুরি প্রয়োজন দেখা দিলে তাদের নিলামে অংশ নিয়ে চড়া দামে সূচি কিনতে হয়।

২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর ইউরোপে এলএনজির চাহিদা বেড়ে যায়। তখন এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজগুলো পানামা খাল ব্যবহার কমিয়ে ইউরোপের দিকে যেতে শুরু করে। এখন তারা আবার পানামা খালে ফিরছে।

প্রশাসক ইলিয়া এসপিনো দে মারোত্তা বলেন, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ায় এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এই বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাস বেশি যাচ্ছে। সে কারণে পানামা খাল দিয়ে এলএনজি পরিবহন আবার বাড়ছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে তিন থেকে চার মাসের জন্য পানামা খালে জাহাজ চলাচল বেড়েছিল। তখন প্রতিদিন ৩৮ থেকে ৪১টি জাহাজ খাল পার হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন ৩৪ থেকে ৩৬টি জাহাজ এই পথে চলাচল করত।

তবে সম্প্রতি চরম আবহাওয়ার কারণে পানামা খাল কর্তৃপক্ষ প্রতিদিন জাহাজ পারাপারের সংখ্যা কমিয়ে ৩২–এ নামিয়েছে। আবহাওয়ার বিশেষ চক্র এল–নিনোর কারণে সৃষ্ট এই পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজার ও উপকূলীয় অবকাঠামোয় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। ফলে পানামা খাল পার হওয়ার খরচ আরও বাড়ছে।

খরায় পানির স্তর কমছে

পানামা খালের মিঠাপানিনির্ভর জলকপাটব্যবস্থা বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল। এই ব্যবস্থায় জাহাজকে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯০ ফুট ওপরে তুলে খালের ভেতরের নৌপথে নেওয়া হয়। পরে অন্য প্রান্তে আবার নিচে নামিয়ে সমুদ্রে পৌঁছে দেওয়া হয়।

এল–নিনোর কারণে খরার সময় পানির স্তর এতটাই কমে যেতে পারে যে জাহাজের ভার কমাতে পণ্য নামাতে হয়, না হলে খালের তলদেশে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

পানামা খালের প্রধান জলাধার গাতুন হ্রদের পানির স্তর কমে যাওয়ায় সমস্যা আরও বেড়েছে। জাহাজগুলো প্রায় ২০ মাইল পথ এই কৃত্রিম হ্রদ দিয়ে পাড়ি দেয়। পানির গভীরতা কমে গেলে পুরো বোঝাই জাহাজ খাল পার হতে পারে না।

পানামা খাল কীভাবে কাজ করে

স্বাভাবিক সময়ে পুরোপুরি পণ্যবোঝাই জাহাজও পানামা খালের কপাটব্যবস্থার মধ্য দিয়ে চলাচল করতে পারে। কিন্তু খরার সময় পানির স্তর কমে গেলে জাহাজের পণ্য কমাতে হয়। একই সঙ্গে কমসংখ্যক জাহাজকে খাল পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।

কেননা খালের জলাধার ও হ্রদে পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখা জরুরি। জলকপাটগুলো পূরণ করতে এই পানি ব্যবহার করা হয়। এসব জলাধার আবার পানামার মানুষের পানীয় জলেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

গাতুন হ্রদের পানির স্তর যত কমে, মিঠাপানির সারচার্জ তত বাড়ে। পানামা খালের চেয়ারম্যান ও দেশটির খালবিষয়ক মন্ত্রী হোসে রামোন ইকাসা জানান, এই সারচার্জ খাল ব্যবহারের মাশুলের ওপর ১ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

খাল কর্তৃপক্ষ তিন মাসের পূর্বাভাস দেয়। এতে জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আগে থেকেই জানতে পারে, কত বড় জাহাজ কখন খাল পার হতে পারবে এবং তাদের কত খরচ হবে। তবে নিলামের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দিনে খাল ব্যবহার করতে চাওয়া জাহাজের জরুরি প্রয়োজন বিবেচনা করা হয়।

পানামার অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি

পানামার অর্থনীতিতে এই খালের গুরুত্ব অনেক। দেশের অর্থনীতির প্রায় ৬ শতাংশ আসে পানামা খাল থেকে। সরকারের রাজস্বেরও বড় অংশ আসে এই খাল থেকে।

খাল থেকে যে আয় হয়, তা সরকারের মোট রাজস্বের পাঁচ ভাগের এক ভাগ। বছরে এর পরিমাণ ৩০০ কোটি ডলারের বেশি।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2026 pujibazarpratidin
Site Customized By NewsTech.Com