চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্ক, গ্রাহকদের আস্থাহীনতা এবং ব্যাপক আমানত উত্তোলনের প্রেক্ষাপটে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যানসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে পর্ষদের সব ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
রোববার (১৪ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংক এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ও ৪৭(৩) ধারায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর অর্পিত ক্ষমতাবলে এবং ব্যাংক, আমানতকারী ও জনস্বার্থে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ সব পরিচালকের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন পর্ষদের সব ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন।
এর আগে বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আলতাফ হুসাইন, দুইজন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) এবং ছয়জন উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি)।
বৈঠক শেষে মো. আলতাফ হুসাইন জানান, ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক অবস্থা, নগদ অর্থের সরবরাহ এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া গ্রাহকদের আমানতের অর্থ কোন খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং অর্থপ্রবাহের বিষয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তথ্য দেওয়া হয়েছে।
চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতি বৈঠকে আলোচনা হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চেয়ারম্যান নিয়োগের বিষয়টি আলোচনায় আসেনি। এটি ছিল একটি নিয়মিত ব্যবসায়িক বৈঠক এবং সেখানে শুধুমাত্র ব্যাংকিং কার্যক্রম নিয়েই আলোচনা হয়েছে।
আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, আজ যেভাবে সেবা দেওয়া হয়েছে, সেবার মান প্রতিনিয়ত আরও বাড়বে এবং আগামীকাল থেকে গ্রাহকরা আরও উন্নত সেবা পাবেন। তারা আশা প্রকাশ করেন, এর আগেও গ্রাহকরা সাময়িক আতঙ্কে টাকা তুলে নিলেও পরবর্তীতে আবার ব্যাংকেই তা ফেরত এনেছেন, এবারও পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বিশেষজ্ঞ দল ব্যাংকটির দেওয়া তথ্য ও সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছে বলেও জানান তারা।
এদিকে, চেয়ারম্যান নিয়োগকে ঘিরে সৃষ্ট অসন্তোষ ও আস্থাহীনতার কারণে গ্রাহকদের ব্যাপক টাকা উত্তোলনে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকটি। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে ইসলামী ব্যাংককে আড়াই হাজার কোটি টাকার সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সহায়তার এ অর্থের মধ্যে দুই হাজার কোটি টাকা নগদ অর্থ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আন্তঃব্যাংক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) সেবা সচল রাখতে আরও ৫০০ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। দৈনন্দিন লেনদেন ও গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ পরিশোধে চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে থাকা ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা চেয়ে আবেদন করেছে। এরই অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে আড়াই হাজার কোটি টাকার সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম. জুবায়দুর রহমান আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করেন। একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে এই নিয়োগের পর থেকেই ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারী, শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহকদের একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ চলছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিতর্কিত ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় ব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। দাবি আদায় না হলে আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচিরও ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো অবৈধ হস্তক্ষেপ করেনি। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকটিতে পাঁচ সদস্যের একটি পর্ষদ ছিল। এর মধ্যে একজন সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় গত ১৬ মার্চ তাকে পরিবর্তন করা হয়। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংক কারও বদলি বা পদোন্নতির বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয়নি।