ই-লোন কী, কীভাবে নেওয়া যায়?

  • Update Time : Sunday, May 17, 2026

ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রসঙ্গ উঠলেই সর্বপ্রথম চোখের সামনে সাধারণত যেসব কর্ম তালিকা ভেসে ওঠে, সেগুলো হলো: ব্যাংকে যাও, গিয়ে ফরম পূরণ করো, কাগজপত্র জমা দিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াও এবং এরপর সেই টাকা হাতে পেতে ক্ষণে ক্ষণে ঘড়ি দেখ।

কিন্তু এখন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই চিত্র বদলাচ্ছে। মোবাইল ফোনের কয়েকটি ক্লিকেই ঋণের আবেদন, যাচাই-বাছাই, এমনকি ঘরে বসেই ঋণের টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।

এই ব্যবস্থাকেই বলা হচ্ছে ‘ই-লোন’ বা ডিজিটাল ঋণ। বাংলাদেশেও ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে এ ধরনের সেবা বাড়াচ্ছে। গত ১১ই মে ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারার আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা বা সার্কুলারও জারি করেছে।

তাই, সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন আসছে: ই-লোন আসলে কী, এটি কীভাবে কাজ করে, কারা নিতে পারে, এতে কী ধরনের সুবিধা বা ঝুঁকি আছে, বাংলাদেশে এটি নতুন কিনা ইত্যাদি।

ই-লোন আসলে কী?

সাধারণভাবে, ই-লোন হলো এমন একটি ঋণসেবা, যেখানে আবেদন থেকে অনুমোদন, এই পুরো প্রক্রিয়াই অনলাইনে সম্পন্ন হয়। গ্রাহককে সরাসরি শাখায় যেতে হয় না।

গ্রাহক ওই ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিয়ে ঋণের জন্য আবেদন করতে পারেন।

সাধারণত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের আর্থিক তথ্য, লেনদেনের ইতিহাস, আয় বা অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে ঋণ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থায় সময় কম লাগলেও তথ্যের নিরাপত্তা এবং শর্তগুলো ভালোভাবে বোঝার বিষয়টি এখানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

ই-লোনের ধারণা কি বাংলাদেশে নতুন?

এই প্রশ্নের উত্তর, না। কারণ বাংলাদেশের একটি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) গত কয়েক বছর ধরে ইতোমধ্যে ই-লোন দিয়ে আসছে।

দেশের সফটওয়্যার ও তথ্য প্রযুক্তি খাতের সংগঠন বেসিসের সাবেক সভাপতি এবং বিডি জবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘এটা নতুন কিছু না। বিকাশ আর সিটি ব্যাংক মিলে যেটা করে, এটা সেটাই। লোন দেয় সিটি ব্যাংক, কিন্তু বিকাশের মাধ্যমে অ্যাপ্লাই করা যায়। শুরুতে এটা ছিল ২০ হাজার, এখন ৫০ হাজার করা হয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই সার্কুলারের কারণ ‘এখন যেকোনো ব্যাংক এটি করতে পারবে’। মেঘনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল আমিনও একই উদাহরণ দেন।

তিনিও বলেন, ‘আগে ওই ব্যাংক বিকাশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে কাজটা করেছে। এখন যেটা হলো, দেশজুড়ে সব ব্যাংকের জন্য এটা প্রযোজ্য হলো। এর মানে ডিজিটাল লোন দেওয়া কখনো নিষেধ ছিল না; এটা নতুন কিছু না, পুরাতন জিনিস’।

তার ভাষায়, ই-লোন হলো ঋণের একটা ‘প্রসেস’ (ঋণ দেওয়ার একটি পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া), এটি ‘ক্যাটাগরি অব লোন না’ (আলাদা কোনো ধরনের ঋণ নয়)।

এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) বা কর্পোরেট যেমন ঋণের বিভিন্ন ক্যাটাগরি, ই-লোন তেমন কোনো আলাদা ক্যাটাগরি নয়।

এসএমই’র সঙ্গে দু’টো জিনিস যোগ হয়েছে। সিএম তথা কটেজ ও মাইক্রো। তাই এটিকে এখন বলা হয়, সিএমএসএমই – কটেজ, মাইক্রো, স্মল, মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজেস। এই ক্যাটাগরির মাঝেই এই ই-লোন, যা ডিজিটালি করা যাবে।

এখন কী কী শর্তে ই-লোন দেওয়ার কথা হচ্ছে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই সেবার নাম হবে বাধ্যতামূলকভাবে ‘ই-লোন’। এই ঋণের প্রধান শর্ত হলো, একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন।

তবে, এই ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ এক বছর। অর্থাৎ, ১২ মাসের মাঝে পরিশোধ করতে হবে। এছাড়া, এ ক্ষেত্রে বাজারভিত্তিক সুদহার কার্যকর হবে। তবে কোনো ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার আওতায় এই ঋণ দিলে সুদের হার হবে সর্বোচ্চ নয় শতাংশ।

অর্থাৎ, কোনো ব্যাংক বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী সুদ নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক যদি ওই ব্যাংককে বিশেষ সুবিধায় অর্থ দেয়, তাহলে গ্রাহকের কাছ থেকে ব্যাংক নয় শতাংশের বেশি সুদ নিতে পারবে না। গ্রাহক কম সুদে ঋণ দেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য।

এ বিষয়ে ফাহিম মাশরুর বলেছেন, ‘সিটি ব্যাংক বিকাশের মাধ্যমে এখন যেটা দিচ্ছে, সেটিও নয় শতাংশ। তবে কোনো ব্যাংক চাইলে নয় শতাংশের কমেও দিতে পারে’।

আর ই-লোনের আবেদন থেকে শুরু করে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ, সব অনলাইনে হবে। অর্থাৎ এই ঋণ পেতে গ্রাহককে কোনো দলিলে স্বাক্ষর করতে হবে না। এর পরিবর্তে বায়োমেট্রিক তথ্য ও টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ব্যবহার করে গ্রাহকের সম্মতি নেওয়া হবে।

যদিও ঋণ অনুমোদনের আগে ব্যাংক গ্রাহকের ঋণের পূর্বের রেকর্ড বা সিআইবি (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) রিপোর্ট যাচাই করবে। তবে ই-ঋণের ক্ষেত্রে সিআইবি অনুসন্ধান বাবদ ব্যাংক বা গ্রাহকের উপর চার্জ প্রযোজ্য হবে না। আর, কোনো ঋণখেলাপি এই ডিজিটাল ঋণ সুবিধা পাবেন না।

এ নিয়ে নির্দেশনায় বলা আছে, ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ২৭কক ধারার বিধান মোতাবেক খেলাপী ঋণগ্রহীতার অনুকূলে ঋণ প্রদানে বিরত থাকার বিষয়ে ব্যাংক যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এক্ষেত্রে, ঋণ বিতরণের পূর্বে অন্যান্য ব্যাংক, ফাইন্যান্স কোম্পানি ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস ইত্যাদি মাধ্যম হতে গৃহীত ঋণের (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।

ই-লোনের সুবিধা কোথায়?

যে ই-লোন নিয়ে কথা হচ্ছে, তুলনা করলে তার পরিমাণ সামান্য বলা চলে, যা ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু এই খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এতে অনেক মানুষ উপকৃত হবেন। কারণ এখানে এক বছরে যে সুদ ধরা হয়েছে, তা তুলনামূলকভাবে কম।

মেঘনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলছিলেন, ‘এনজিও’র কাছে গেলে প্রতি সপ্তাহে কিস্তি শোধ করতে হয়। সেক্ষেত্রে এখানে ১২ মাসে বাড়তি ৪-৫ হাজার টাকা দিতে হবে। তবে এখানে সব ব্যাংকের সুদ এক রকম হবে না। কেউ কম দিতে পারে, কেউ বেশি দিতে পারে। কেউ সীমার মাঝে থাকবে, কেউ শর্ত দিতে পারে।’

তিনি বলেন, আর্থিক সেবার আওতা বাড়াতে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যারা সাধারণত ব্যাংকে যান না বা যেতে পারেন না, তাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করাই এর উদ্দেশ্য।

‘৫০ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কিনলেও তা কোরবানিতে বিক্রি করে দেওয়া যায়। এই ৫০ হাজার টাকা এখানে জাস্ট ঋণ। এটা পুঁজি না। এটা তার পুঁজিতে সাপোর্ট।’

বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুরও বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন।

তিনিও মনে করেন, এই ই-লোন ক্ষুদ্র ঋণ না হলেও ‘ক্ষুদ্র ঋণের মতোই…ক্রেডিট কার্ডও একপ্রকার ক্ষুদ্র ঋণ। পার্থক্য হলো, ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে অনেক ডকুমেন্টস দরকার হয়; যারা চাকরি করেন, তাদেরই দেওয়া হয়। আর এ ক্ষেত্রে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকলেই ব্যাংক এই ঋণ দিতে পারে। তাই প্রান্তিক মানুষ, শিক্ষার্থী, ছোট ব্যবসায়ীরাও এটা পেতে পারেন।’

বাংলাদেশ ব্যাংকও তার সার্কুলারে বলেছে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তিকরণ ও ডিজিটাল আর্থিক সেবা ব্যবহারে অভ্যস্ত করার মাধ্যমে ক্যাশলেস সমাজ বিনির্মাণে ‘ই-ঋণ’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

ঝুঁকির জায়গাগুলো কী কী?

মোহাম্মদ নূরুল আমিন ও ফাহিম মাশরুর দু’জনেই বলেন, ই-লোনে কিছু ঝুঁকি রয়েছে। ‘সুদের হার নয় শতাংশ থাকলে ব্যাংকগুলো আগ্রহী হবে না। ব্যাংক ১০০ জনকে ই-লোন দিল, সেখান থেকে ২০-২৫ জন লোন ফেরত না দিলে ব্যাংকের লস হবে। তাই রিস্ক কভার করার জন্য এ ক্ষেত্রে এই নয় শতাংশের লিমিট থাকা উচিত না।’

‘কারণ এটা সিকিউরিটি ছাড়া লোন। কর্পোরেট লোনে বন্ধক থাকে, সিকিউরিটি থাকে। এখানে সিকিউরিটি নাই। এটা ঠিক যে কেউ না দিলে তার রেকর্ড থাকছে। তখন অন্য কোনো ব্যাংক থেকে সে লোন পাবে না, এটা সিস্টেমে থাকবে। কিন্তু ব্যাংকের তো রিস্ক। তাই রিস্ক কাভার করতে বিশ্বের সব দেশেই এই ধরনের লোনের ক্ষেত্রে ইন্টারেস্ট রেট বেশি ধরে।’

তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, ৫০ হাজার টাকার জন্য গ্রাহকের পেছনে ছুটতেও তো ব্যাংকের একটা খরচ হবে। তাই, এই ধরনের ছোট ছোট লোনে সুদের হার অনেক বেশি থাকে। ২০-২৫ শতাংশ থাকলে ১০ জনের দুই জন না দিলেও ব্যাংকের রিস্ক কভার হয়ে যায়। সেকারণেই বিদেশে কর্পোরেট লোনের ক্ষেত্রে রেট কম থাকে, এইসব লোনে বেশি থাকে।

তার মতে, গ্রাহকের এখানে কোনো ঝুঁকি নেই।

‘ঝুঁকি থাকলেও সামনের দিকে আমাদের এদিকে যেতে হবে । ডিজিটাল ব্যাংক আছে বিশ্বে, ব্যাংকগুলোকে ডিজিটাল ব্যাংকিং-এর জন্য লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে।’

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2026 pujibazarpratidin
Site Customized By NewsTech.Com