আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলতি মৌসুমে শুধু আম কেনাবেচাই ছাড়িয়ে যাবে ৩ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি বাগান ও আড়তের শ্রমিক খরচ, ক্যারেট বা প্লাস্টিকের ঝুড়ি সরবরাহ এবং দেশজুড়ে আম পৌঁছানোর বিশাল পরিবহন খাত থেকে আরো কয়েক হাজার কোটি টাকা আয় হবে। মৌসুমের শুরুতে আমের বেচাকেনা ও গত বছরের হিসেব অনুযায়ী এমনটি ধারণা করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও আম ব্যবসায়ীরা।
জেলায় সুমিষ্ট আম ‘গোপালভোগ’ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য ‘ক্ষীরসাপাত’ প্রায় শেষের পথে। বর্তমানে বাজার দখল করে আছে ল্যাংড়া, লক্ষণভোগ, বোম্বাই, আম্রপালি, সুরমা ফজলি ও ব্যানানা ম্যাঙ্গোসহ অন্যান্য জাত।
বাজার ঘুরে চাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমের এই সময়ে এসে ক্ষীরসাপাতের বাজার বেশ গরম। মানভেদে এই আম বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৫ হাজার টাকা মণ দরে। এছাড়া স্বাদে-গন্ধে অনন্য ল্যাংড়া আম সাড়ে ৪ হাজার টাকা, আম্রপালি ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা, ফজলি ১ হাজার থেকে ১৫০০ টাকা এবং ব্যানানা ম্যাঙ্গো প্রতি মণ ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে এই জেলায় আম বাগানের সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। ২০১৫ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম বাগানের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৬ হাজার ৬৫০ হেক্টর, যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টরে। জেলার ছোট-বড় বাগানগুলোর প্রায় ৮২ লাখ গাছ থেকে এখন আম উৎপাদিত হচ্ছে। চলতি বছর আম উৎপাদনের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪ লাখ টন নির্ধারণ করা হলেও, মাঠের পরিস্থিতি বিবেচনা করে কৃষি বিভাগ আশা করছে এবার উৎপাদন সাড়ে চার লাখ টনেরও বেশি হবে।
উৎপাদিত আম বিক্রির জন্য জেলায় চারটি প্রধান বাজার রয়েছে। এর মধ্যে দেশের সবচেয়ে বড় আমের বাজারটি বসেছে ঐতিহ্যবাহী কানসাটে। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানে আমের পাইকারি ও খুচরা কেনাবেচা চলছে। এই বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে প্রায় তিন শতাধিক আড়ত। আমের এই জমজমাট কারবারের ওপর ভর করে জেলার অর্থনীতি এখন চাঙ্গা।
বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমকে এখনো পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে না পারায় স্থানীয় আমচাষি ও কৃষক নেতাদের মনে আক্ষেপ রয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও উদ্যোক্তা মুনজের আলম মানিক বলেন, “বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ আম চাঁপাইনবাবগঞ্জেই উৎপাদিত হয়। পৃথিবীতে আম একটি বড় শিল্প পণ্য হলেও আমরা এখনো এটাকে পুরোপুরি শিল্প পণ্য হিসেবে নিতে পারিনি। আমরা আম প্রক্রিয়াজাতকরণ করতে পারছি না। যদি এখানে আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তোলা যায়, তবে আমের বর্তমান বাজার মূল্য এক ধাক্কায় অন্তত ৩ গুণ বেড়ে যাবে এবং জেলায় বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।”
সার্বিক উৎপাদন ও লক্ষ্যমাত্রার বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. ইয়াসিন আলী বলেন, “জেলায় চলতি বছর আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৪ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যেতে পারে। গত বছর জেলায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার আম বেচাকেনা হয়েছিল। এবারের চূড়ান্ত হিসাব এখনো তৈরি না হলেও, যেহেতু উৎপাদন বেশি এবং বাজারে দামও ভালো, তাই সামগ্রিক বেচাকেনা গত বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। মৌসুমের আবহাওয়া এখন পর্যন্ত আমের অনুকূলে রয়েছে।”
তিনি বলেন, “বাণিজ্যের এই চাঙ্গা ভাব এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববাজারেও ছড়িয়ে পড়ছে। গত বছর চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আম রপ্তানি হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলতি মৌসুমেও বিদেশে আম পাঠানো শুরু হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।”