অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছাড়াল বাংলাদেশের জিডিপি

  • Update Time : Thursday, June 11, 2026

বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন মাইলফলক অতিক্রম করে অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলারের ঘরে প্রবেশ করেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) দাঁড়িয়েছে ৬১ লাখ ২০ হাজার ২০৯ কোটি টাকা, যা মার্কিন ডলারে প্রায় ৫০১ বিলিয়ন। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা (৪৫৬ বিলিয়ন ডলার)।

বুধবার (১০ জুন) প্রকাশিত সাময়িক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাময়িকভাবে ৪.১৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৩.৪৯ শতাংশের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে প্রবৃদ্ধির এই ইতিবাচক হারের বিপরীতে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেছে নিম্নমুখী প্রবণতা।

জিডিপির আকার ৫০১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়া প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, ‘জিডিপির আকার ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক দিক। এটি ইঙ্গিত দেয় যে অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। তবে শুধুমাত্র আকার বৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে দেখতে হবে এই প্রবৃদ্ধির সুফল কতটা বিস্তৃত হচ্ছে।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত এমন পরিবেশ খোঁজেন যেখানে স্থিতিশীলতা রয়েছে।’

জিডিপি প্রবৃদ্ধি বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সার্বিকভাবে প্রবৃদ্ধি বাড়াও ভালো লক্ষণ, কিন্তু আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা, যা টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং কর্মসংস্থানমুখী—বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের মাধ্যমে।’

অধ্যাপক বিদিশা মনে করেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তবে এর চেয়েও বেশি জরুরি হচ্ছে প্রবৃদ্ধির গুণগত মান। অর্থাৎ এই প্রবৃদ্ধি কীভাবে আসছে, কোন খাত থেকে আসছে এবং এর সুফল সাধারণ মানুষ কতটা পাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘শুধু সংখ্যার ভিত্তিতে প্রবৃদ্ধি মূল্যায়ন না করে আমাদের দেখতে হবে এই প্রবৃদ্ধি অন্তর্ভুক্তিমূলক কি না। এক বছরে প্রবৃদ্ধি সামান্য বাড়া বা কমার বিষয়টি খুব বড় বিষয় নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবৃদ্ধির কাঠামো ও প্রভাব।’

খাতভিত্তিক প্রবৃদ্ধিতে দেখা যায়, কৃষি খাতে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২.৭৮ শতাংশ, যা আগের বছরের ২.৪২ শতাংশের তুলনায় ০.৩৬ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়েছে। সাময়িক হিসাবে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২.৮৬ শতাংশ, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৩.৭১ শতাংশের তুলনায় ০.৮৫ শতাংশ কম।

অধ্যাপক বিদিশা উল্লেখ করেন, ‘কৃষি খাতে খুব বেশি প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়, কারণ এই খাতটি প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে পরিচালিত হয়। তবে সামগ্রিকভাবে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়েছে, যা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছুটা গতি ফিরছে বলেই প্রতীয়মান হয়।’

তবে তিনি বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেন শিল্প, বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায়। তার ভাষায়, ‘একটি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোগত রূপান্তরের জন্য ম্যানুফ্যাকচারিং খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই খাত থেকেই ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির বড় অংশ আসার কথা। ফলে এখানে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া আমাদের জন্য সতর্কবার্তা।’

তিনি আরও বলেন, ‘ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগের ধীরগতি এবং ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে নেতিবাচক প্রবণতা নীতি-নির্ধারকদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। কারণ এই খাতগুলোই অর্থনীতির ড্রাইভিং ফোর্স হিসেবে কাজ করে।’

সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪.৫৯ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের ৪.৩৫ শতাংশ থেকে ০.২৪ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।

তিনি আরও বলেন, ‘ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগের ধীরগতি এবং ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে নেতিবাচক প্রবণতা নীতি-নির্ধারকদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। কারণ এই খাতগুলোই অর্থনীতির ড্রাইভিং ফোর্স হিসেবে কাজ করে।’

প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্কের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর প্রধান মাধ্যম হচ্ছে কর্মসংস্থান। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, প্রবৃদ্ধির হার অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না, বিশেষ করে শিল্প ও সেবা খাতে। ফলে প্রবৃদ্ধি হলেও এর সুফল সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে এমন প্রবৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিতে হবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং আয় বৈষম্য কমাতে সহায়ক হয়।’

এদিকে জিডিপির সঙ্গে বিনিয়োগের অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ২৭.৯৩ শতাংশ, যা আগের বছর ছিল ২৮.৫৪ শতাংশ। একইভাবে দেশজ সঞ্চয় কমে ২১.৩৮ শতাংশ এবং জাতীয় সঞ্চয় কমে ২৬.৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু জিডিপির আকার বৃদ্ধি নয়, প্রবৃদ্ধির গুণগত মান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধিই ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2026 pujibazarpratidin
Site Customized By NewsTech.Com