প্রণোদনার বিশাল বরাদ্দ, অর্থ ছাড়ে ধীরগতি

  • Update Time : Monday, October 19, 2026

অর্থনীতি চাঙা করা, বন্ধ শিল্পকারখানা চালু এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে এ প্যাকেজের আকার বাড়িয়ে করা হয় ৬২ হাজার কোটি টাকা।

তবে, বিশাল অঙ্কের এ বরাদ্দের বিপরীতে অর্থ ছাড়ের গতি বেশ ধীর। ঘোষণার প্রায় পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এ তহবিল থেকে বিতরণ করা হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকারও কম।

গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ১১ হাজার ৯৫৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে, যা মোট প্যাকেজের ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ পাঁচ মাসেও বরাদ্দের ৮০ শতাংশের বেশি অর্থ ছাড় হয়নি। এতে বন্ধ শিল্পকারখানা চালু ও অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে নেওয়া এ উদ্যোগের বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ১৫টি প্রাক্‌-অর্থায়ন ও পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে এ পর্যন্ত ১১ হাজার ৯৫৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। আরও ২ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার অর্থায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিতরণ করা ও প্রক্রিয়াধীন অর্থ মিলিয়ে পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৫১৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।

বন্ধ শিল্পকারখানা ও সেবা খাত পুনরায় চালু করতে গঠিত সহায়ক প্রাক্‌-অর্থায়ন স্কিমে বরাদ্দ রয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত এ খাতে বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ৫৬১ কোটি টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দের মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশ পেয়েছেন উদ্যোক্তারা।

এ খাতে আরও ৯২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার অর্থায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিতরণ ও প্রক্রিয়াধীন অর্থ মিলিয়ে মোট পরিমাণ ১ হাজার ৪৯০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এরপরও এ খাতের মোট বরাদ্দের তুলনায় অর্থায়নের অগ্রগতি খুবই কম।

এ স্কিমের আওতায় শিল্পোদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার কথা। এর মধ্যে, ১ শতাংশ সুদ উদ্যোক্তাদের বহন করার কথা থাকলেও বাকি ৬ শতাংশ সরকার ভর্তুকি হিসেবে দেবে। প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের বিপরীতে এখন পর্যন্ত বিতরণ করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ। প্রক্রিয়াধীন অর্থ যোগ করলেও মোট অগ্রগতি ২৪ শতাংশের কম।

এ প্যাকেজের উদ্দেশ্য ছিল অর্থনীতিতে তারল্য বাড়ানো, শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সচল রাখা, নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কিন্তু পাঁচ মাসেও অর্থ ছাড়ের গতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে না পৌঁছানোয় এসব লক্ষ্য বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে ক্রমপুঞ্জীভূত বিতরণের পরিমাণ ৬ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। কটেজ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিশেষ স্কিমে বিতরণ করা হয়েছে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সিএমএসএমই খাতে চলতি মূলধন পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে বিতরণ করা হয়েছে প্রায় ৯০৮ কোটি টাকা।

সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য গঠিত স্কিমে বিতরণ করা হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নেওয়া পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে বিতরণ হয়েছে ২৯৩ কোটি টাকা।

বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে অর্থায়ন স্কিমে বিতরণ করা হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র সৃষ্টির পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে বিতরণের পরিমাণ ৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। স্টার্টআপ খাতে অর্থায়ন স্কিমে বিতরণ হয়েছে ৩২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এ খাতে আরও ৫ কোটি টাকার অর্থায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

অন্যদিকে, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির অর্থায়ন স্কিমে ১ হাজার কোটি টাকা, গ্রিন ফ্যাক্টরি বিল্ডিং ও গ্রিন ইন্ডাস্ট্রিজ খাতে পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে ৫২৭ কোটি টাকা এবং চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রপ্তানিমুখী খাতে ৯৮ কোটি টাকা বিতরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

প্রণোদনা প্যাকেজের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করা, উৎপাদন বাড়ানো, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কিন্তু ঘোষণার প্রায় পাঁচ মাস পরও অর্থ ছাড়ের ধীরগতিতে এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এদিকে জ্বালানি সংকটসহ নানা সমস্যায় শিল্পকারখানাগুলো চাপে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রণোদনার অর্থ দ্রুত উদ্যোক্তাদের হাতে পৌঁছানো না গেলে বন্ধ কারখানা চালু করা, উৎপাদন বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, ৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের পাঁচ মাস পরও বিতরণ করা হয়েছে এক-পঞ্চমাংশের কম অর্থ। বিশেষ করে বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর জন্য বরাদ্দ করা ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিলে বিতরণ হয়েছে মাত্র ৫৬১ কোটি টাকা। ফলে প্রণোদনার অর্থ দ্রুত ছাড় করা এবং সংকটে থাকা শিল্প খাতে তা কার্যকরভাবে পৌঁছানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলছেন খাত সংশ্লিষ্টা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2026 pujibazarpratidin
Site Customized By NewsTech.Com