খরসুতি গ্রামটা খুব বড় না। কিন্তু গ্রামের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো ঝুপড়ি ঘর যেন গোটা জীবনের গল্প লুকিয়ে রেখেছে। এই ঘরেই থাকেন ৭৫ বছরের রাজলক্ষ্মী কর্মকার। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর, ক্লান্ত চোখ, আর প্রতিদিনের দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা এক জীবন।
রাজলক্ষ্মী খ্রিস্টান। প্রায় চার দশক ধরে এই গ্রামেই তার বসবাস। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি বুঝতে পারেননি, বেঁচে থাকাটাই একদিন এত বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
ঝুপড়ি ঘরের চাল ফাঁকফোকর দিয়ে আলো ঢোকে। বিদ্যুৎ নেই। সন্ধ্যা নামলেই অন্ধকারে ডুবে যায় ঘর। বৃষ্টি এলেই শুরু হয় আরেক যুদ্ধ। ঘরের ভেতর পানি ঢুকে পড়ে। তখন সন্তান আর নাতি-নাতনিদের নিয়ে এক জায়গায় গুটিশুটি হয়ে বসে থাকেন তিনি।
“বৃষ্টি হলে আমরা একসাথে জড়সড় হয়ে বসে থাকি,”
কাঁপা কণ্ঠে বলেন রাজলক্ষ্মী।
“আর যীশুর কাছে শুধু এইটুকু প্রার্থনা করি—হে প্রভু, বৃষ্টি থামাও।”
শেষ বয়সে শরীর তাকে আর সঙ্গ দেয় না। চোখে ঝাপসা দেখে, হাঁটতে কষ্ট হয়, শরীরজুড়ে নানা অসুখ। কিন্তু ওষুধ কেনার মতো সামর্থ্য নেই। সরকারি কোনো ভাতা নেই। এলাকার জনপ্রতিনিধিরাও খুব একটা খোঁজ নেন না।
রাজলক্ষ্মী বলেন, “সন্তান আছে, নাতিপুতি আছে। তবু মনে হয় আমি একা। শেষ বয়সে এসে এমন কষ্ট হবে, কখনো ভাবিনি।”
স্থানীয়দের কথায়, বোয়ালমারী উপজেলায় এতটা অসহায় জীবন খুব কম পরিবারই কাটায়। আধুনিক যুগে এসেও রাজলক্ষ্মী কর্মকারের পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। নিয়মিত খাবার জোটে না, চিকিৎসা তো আরও দূরের কথা।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ইমদাদুল জানান, তার ওয়ার্ডে এটি একমাত্র খ্রিস্টান পরিবার। কাজকর্মের অনিয়মের কারণে পরিবারটির অভাব লেগেই থাকে বলে মন্তব্য করলেও, রাজলক্ষ্মীর জন্য বয়স্ক ভাতার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন তিনি।
ময়না ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আ. হক বলেন, “খোঁজ নিয়ে রাজলক্ষ্মী ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।”
রাজলক্ষ্মীর চার ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে। কিন্তু দারিদ্র্যের কষাঘাতে পরিবারটি কখনোই স্বচ্ছল হতে পারেনি। এখন তিনি সেজো ও ছোট ছেলের সঙ্গে থাকেন। দিন শেষে তার চাওয়া খুব বড় কিছু না—একটু শুকনো ঘর, একটু আলো, আর অসুখে ওষুধ।
জীবনের শেষ বিকেলে দাঁড়িয়ে রাজলক্ষ্মী কর্মকার আজও অপেক্ষা করেন। হয়তো কারও সহানুভূতির, হয়তো সমাজের একটু মানবিক ছোঁয়ার।
আর প্রতিটি বৃষ্টির রাতে, ঝুপড়ির ভেতর বসে, তিনি আবারও যীশুর কাছে হাত জোড় করেন— এই কষ্টটা যেন আর একটু সহনীয় হয়।