দেশের শেয়ারবাজারে দুর্নীতি ও প্রতারণার এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করেছে লা মেরিডিয়ান হোটেলের মালিকানাধীন বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেড। কাগজে-কলমে সাজানো মুনাফার গল্পে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক ও শেয়ারবাজার—দুই খাত থেকেই প্রায় ৩,৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।
ভুয়া জমির দলিল, জাল নিরীক্ষা প্রতিবেদন, অতিমূল্যায়িত সম্পদ ও কৃত্রিম বিনিয়োগ কাঠামোর মাধ্যমে সাজানো এই প্রতারণাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন— ‘চামচা পুঁজিবাদের ভয়াবহ উদাহরণ’।
এর নেপথ্যের মূল হোতা, বিতর্কিত ব্যবসায়ী আমিন আহমেদ, ইতিমধ্যেই টাকা পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন।
তদন্তে উঠে আসা চাঞ্চল্যকর তথ্য
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গঠিত বিএসইসি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এই কেলেঙ্কারির পুরো চিত্র উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় বেস্ট হোল্ডিংস একটি “Unholy Nexus” গড়ে তুলে আর্থিক খাতকে পঙ্গু করে দেয় এবং লুটপাটের সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। অবাক করার বিষয়, এই রিপোর্ট প্রকাশের পরও প্রায় ১০ মাস ধরে গোপন রাখা হয়েছিল।
প্রতারণার কেন্দ্রে ছিল জমির ভুয়া দলিল। কোম্পানিটি ৪,০৮১ কোটি টাকার সম্পদের কাগজ দেখালেও বাস্তবে এর কোনো বৈধ মালিকানা নেই। এই কাগুজে সম্পদের ওপর নির্ভর করে সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী ব্যাংক ও আইসিবি—এই পাঁচটি সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ১,৯৬৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। এর মধ্যে ৯০০ কোটিরও বেশি এখন নিশ্চিত লোকসান; সোনালী ব্যাংক একাই হারিয়েছে ৪২৩ কোটি টাকা, যা সাধারণ আমানতকারীদের টাকা।
দেশ থেকে টাকা পাচারের প্রমাণ
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই অর্থের একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। দ্রুত স্বাধীন ফরেনসিক অডিট ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তদন্তে যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এই অনিয়মের শুরু ২০১৭ সালে, যখন ড. খায়রুল হোসেন বিএসইসির চেয়ারম্যান ছিলেন। মাত্র ৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকার পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানিকে তিনি ১,২০০ কোটি টাকার বন্ড ছাড়ার অনুমতি দেন, যা আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। পরে শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশন এসে এই অনিয়মকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। তারা ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারের বিপরীতে ৫৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ ৬৫ টাকায় বিক্রির অনুমতি দেয়—যা পরিণত হয় সরকারি ব্যাংক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির ফাঁদে।
ক্ষমতাশালী মহলের প্রত্যক্ষ যোগসাজশ
তদন্ত প্রতিবেদনে সাবেক মন্ত্রী, সেনা কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাবশালী কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে শেখ হাসিনার চাচা শেখ কবির হোসেন ও ডিজিএফআই-এর সাবেক মহাপরিচালক লে. জে. (অব.) মামুন খালেদকে পরিচালক পদ থেকে অযোগ্য ঘোষণা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়া রেস ম্যানেজমেন্টের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. হাসান তাহের ইমাম মিউচুয়াল ফান্ডের অর্থ বেস্ট হোল্ডিংসের শেয়ারে ঢুকিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিতে ফেলেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিল সেন্টিনেল ট্রাস্টি, গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স, আর্গাস ক্রেডিট রেটিং ও ইমার্জিং ক্রেডিট রেটিং—সব মিলে তৈরি হয় ভয়াবহ “কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট” চক্র, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থা জেনেও বন্ধ করেনি।
কঠোর শাস্তির সুপারিশ
তদন্ত কমিটি এই কেলেঙ্কারিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির সুপারিশ করেছে—
আমিন আহমেদ ও হাসান আহমেদকে ১০ কোটি টাকা করে (মোট ২০ কোটি) জরিমানা
রেস ম্যানেজমেন্টকে ২৫ কোটি টাকা জরিমানা ও নিবন্ধন বাতিল নাফিজ সরাফাত ও হাসান তাহের ইমামকে আজীবনের জন্য শেয়ারবাজারে নিষিদ্ধ বিএসইসি’র সাবেক চেয়ারম্যান খায়রুল হোসেন ও শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করে দুদকে তদন্তের সুপারিশ ১০টি মিউচুয়াল ফান্ডের নিবন্ধন বাতিল, আইসিবি ও বিজিআইসিকে জরিমানা, সংশ্লিষ্ট ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি ও অডিট ফার্মগুলোর লাইসেন্স স্থগিতের পরামর্শ।
এই কেলেঙ্কারিকে বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন— “এটাই বাংলাদেশের শেয়ারবাজার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় করপোরেট প্রতারণা।”